করোনার মহামারিতে বিশ্বজুড়ে কম্পিউটার ল্যাপটপ পণ্যের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। এই সংকটের ঢেউ আছড়ে পড়েছে দেশের প্রযুক্তি পণ্যের বাজারেও। করোনার মধ্যে ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার এবং মনিটরের চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছে না দেশের শীর্ষ প্রযুক্তি পণ্যের আমদানিকারক ও পরিবেশক প্রতিষ্ঠানগুলো। সরবরাহের এ ঘাটতির মধ্যেই কম্পিউটারসহ সব ধরনের প্রযুক্তি পণ্যের দাম ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
সংশ্নিষ্টরা বলছেন, গত বছর করোনার প্রাদুর্ভাব শুরুর পরই প্রযুক্তি পণ্য উৎপাদনে প্রভাব পড়তে শুরু করে। এ সময়ে বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেটভিত্তিক প্রযুক্তি পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পেলেও লকডাউনসহ বিভিন্ন কারণে কারখানা বন্ধ থাকায় কম্পিউটার-ল্যাপটপ এবং সংশ্নিষ্ট যন্ত্রাংশ উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। বিশেষ করে ডিসপ্লে প্যানেল, চিপ ও সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় চলতি বছরের শুরুতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ পরিলক্ষিত হওয়ার পর কম্পিউটার পণ্যের ঘাটতি আরও ঘনীভূত হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ সেমিকন্ডাক্টর নির্মাতা সিস্কো কর্তৃপক্ষ বিবিসিকে জানিয়েছে, সরবরাহ সংকট পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে আরও এক থেকে দুই বছর সময় লাগতে পারে। ইন্টারনেটের বহুল ব্যবহার, ফাইভজির আবির্ভাব, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিতে চিপের ব্যবহার বৃদ্ধিতে প্রসেসর এবং সেমিকন্ডাক্টরের চাহিদা আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। কিন্তু করোনাকালীন উৎপাদন সক্ষমতা তো বাড়েইনি, উল্টো কমেছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে বিশ্বের শীর্ষ চিপ ও সেমিকন্ডাক্টর নির্মাতা সিস্কো এবং ইন্টেলের মতো কোম্পানিগুলো বাড়তি বিনিয়োগ করছে। নির্মাতারা আশা করছেন, আগামী ছয় মাস পর পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
এদিকে, করোনার সংকটে দেশের স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় অনলাইনে ক্লাসের হার বেড়েছে। অফিসিয়াল কাজেও ল্যাপটপের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। শিক্ষার্থীদের কাছে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে স্বল্প দামের ল্যাপটপের চাহিদা ছিল সবচেয়ে বেশি। তবে চাহিদা থাকলেও বাজারে নেই স্বল্প দামের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের গ্রাহকপ্রিয় ল্যাপটপ। দেশে স্বল্প দামের ল্যাপটপ বিক্রিতে সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটি ব্র্যান্ড আসুস এবং অ্যাসার এখন এন্ট্রি লেভেলের (কম দামি) উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। বিকল্প হিসেবে মিলছে কিছু চায়না ব্র্যান্ডের সেলেরন প্রসেসরের ল্যাপটপ, যার র‌্যাম এবং হার্ডড্রাইভ স্টোরেজ চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত কম। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে আসুস পণ্যের কান্ট্রি ম্যানেজার আল ফুয়াদ সমকালকে বলেন, 'আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরনের ল্যাপটপেই ক্রাইসিস যাচ্ছে। চাহিদার তুলনায় খুব কম সরবরাহ পাচ্ছি। পাশাপাশি এন্ট্রি লেবেলের ল্যাপটপই তৈরি করছে না আসুস। ফলে চাহিদা থাকলেও কম দামের ল্যাপটপ বাজারে দিতে পারছি না।'
ল্যাপটপসহ সব ধরনের প্রযুক্তি পণ্যেরই সংকট রয়েছে জানিয়ে দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তি পণ্য আমদানিকারক ও পরিবেশক স্মার্ট টেকনোলজিসের মহাব্যবস্থাপক (বিক্রয়) জাফর আহমেদ বলেন, কম্পিউটার পণ্যের সংকট এতটাই নাজুক যে, অধিকাংশ নির্মাতা ক্ষেত্রবিশেষে চাহিদার ৩০ ভাগও সরবরাহ করতে পারছে না। সরবরাহ কম থাকায় বিভিন্ন দেশের আমদানিকারদের মধ্যেও অর্ডারকৃত পণ্য পেতে এক ধরনের প্রতিযোগিতা হচ্ছে। এ অবস্থায় নির্মাতারা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। কেউ বাড়তি দাম দিতে না চাইলে অন্যরা সেটা লুফে নিচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়েই বাড়তি দামে পণ্য আমদানি করতে হচ্ছে।
ক্যানন পণ্যের পরিবেশক জেএএন অ্যাসোসিয়েটসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল্লাহ এইচ কাফি বলেন, করোনার প্রাদুর্ভাবে পণ্যের উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বভাবতই এ জন্য শুধু কম্পিউটার কিংবা ল্যাপটপ নয়, সব ধরনের প্রযুক্তি পণ্যেরই দাম বাড়ছে।
দেশের অন্যতম শীর্ষ খুচরা বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান রায়ান্স আইটির প্রধান নির্বাহী আহমেদ হাসান জানান, সরবরাহ কম থাকায় বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে। ফলে সব ধরনের প্রযুক্তি পণ্যেই ২০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেড়েছে। এ অবস্থা বজায় থাকলে দাম হয়তো আরও বাড়বে।
এদিকে, দেশীয় ল্যাপটপ নির্মাতা ওয়ালটনের নির্বাহী পরিচালক ও কম্পিউটার পণ্য বিভাগের প্রধান নির্বাহী ইঞ্জিনিয়ার লিয়াকত আলী সমকালকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে কম্পিউটার পণ্যের যন্ত্রাংশের তীব্র সংকট রয়েছে। এ সংকটের মধ্যে যন্ত্রাংশের দাম ১৫ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এ জন্যই ল্যাপটপের দাম বাড়ছে। তবে আমরা আমাদের স্টকে থাকা যন্ত্রাংশের মাধ্যমে এখনও ল্যাপটপ তৈরি করছি। এ জন্য আগের দামেই ল্যাপটপ দিতে পারছি। স্টক হয়তো আর এক-দুই মাস চলবে। এরপর নতুন যন্ত্রাংশ আমদানি করতে হবে। তখন দাম না বাড়িয়ে উপায় থাকবে না। উল্লেখ্য, ওয়ালটনের সর্বনিম্ন ২৩ হাজার ৫০০ টাকার ল্যাপটপ বাজারে রয়েছে।
বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতি শাহীদ উল মুনীর বলেন, সরবরাহ সংকট এবং দাম বৃদ্ধি আমাদের একার সমস্যা নয়, এটি বৈশ্বিক সমস্যা। করোনার মধ্যেই সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করতে পণ্য নির্মাতারা নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে সরবরাহ স্বাভাবিক হতে ছয় মাস থেকে এক বছর সময় লাগবে।

মন্তব্য করুন