করোনাকালে ঘরের কাজে নারীর চাপ বেড়েছে অনেক, বেড়েছে অর্থ সংকটও। শহর ও গ্রাম মিলিয়ে গত বছরে ৪৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ পরিবার থেকে অন্তত একজন কাজ হারিয়েছেন বা কাজ পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। শতকরা ৭৭ দশমিক ৭৮ নারীপ্রধান পরিবার অর্থনৈতিক অনটনে পড়েছে। কাজ হারিয়ে অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে শহরের ৭৩ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ এবং গ্রামের ৯২ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ।

শনিবার 'বাংলাদেশে ২০২০-এ করোনা চলাকালে সংসারের সেবাকাজের দ্রুত বিশ্নেষণ' শীর্ষক এক অনলাইন জরিপ উপস্থাপন অনুষ্ঠানে এ তথ্য উঠে এসেছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন ইউএন উইম্যানের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ সোকো ইশিকাওয়া। এ ছাড়া জরিপের ওপর আলোচনা করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন ও ফিন্যান্স ডিভিশনের ডেপুটি সেক্রেটারি মেহেদী মাসুদুজ্জামান। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বিএনপিএসের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর, অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবীর এবং অক্সফামের উইম্যান এমপাওয়ারমেন্ট অ্যান্ড কেয়ার প্রোগ্রামের ম্যানেজার সার হল। সভাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম।

জরিপে অংশ নেওয়া উত্তরদাতাদের মধ্যে শতকরা ৭৬ জন বলেছেন, মহামারির সময়ে তাদের পরিবারের আয় কমে গেছে। ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা আয় করা ব্যক্তিদের মধ্যে শতকরা ৬৮ জনের আয় কমেছে। এর অর্থ হচ্ছে, এই মানুষগুলো দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হয়েছে। ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয়কারীদের শতকরা ৭৩ জনের আয়ও কমেছে। দেখা যায়, কৃষিনির্ভর পরিবারগুলোর অবস্থা কিছুটা ভালো থাকলেও যারা অকৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত, অর্থাৎ শ্রমজীবী, তাদের অবস্থা বেশি খারাপ।

নারীদের অনেকেই কাজ বা চাকরি হারিয়েছেন। পাশাপাশি বেড়েছে অস্বাভাবিক মাত্রায় ঘরের কাজের চাপ। বাংলাদেশে কাজে নিযুক্ত মানুষের মধ্যে শতকরা ৯১ দশমিক ৩ জন অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। তাদের শতকরা ৯৬ দশমিক ৭ জন নারী। যখন অভাবের কারণে একটার পর একটা সম্পদ হাতছাড়া হতে থাকে, তখন নারীই সর্বস্বান্ত হয় প্রথমে। রান্না করা, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং ধোয়ার কাজ গ্রামীণ নারীর মতো হলেও আশ্চর্যজনকভাবে শহরে নারীর কাজ ১২৮ ভাগ বেড়েছে এই মহামারির সময়ে। শতকরা ৮৫ ভাগ কর্মজীবী নারী অমূল্যায়িত গৃহস্থালি কাজে অনেকটা সময় দিয়েছেন এবং সেটা চার ঘণ্টারও বেশি।

করোনার আগে গৃহিণীদের মধ্যে শতকরা ৭১ দশমিক ৫ জন সাধারণত তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা অমূল্যায়িত গৃহস্থালি কাজে ব্যয় করতেন। করোনাকালে এসে তাদের মধ্যে শতকরা ৩৭ দশমিক ৮ জনের কাজের সময় বেড়েছে। এ সময়ে ঘরের কাজে পুরুষের অংশগ্রহণও বেড়েছে। নারীর ঘরের কাজের পরিমাণ এতটাই বেড়েছে যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টার কাজ ছয় থেকে সাত বা আট ঘণ্টার কাজের তালিকায় পৌঁছে গেছে।

পাঁচ সদস্যের ফোরাম 'ফরমাল রিকগনিশন অব দ্য উইম্যান'স আনকাউন্টেড ওয়ার্ক'-এর উদ্যোগে এই জরিপ পরিচালনা ও তৈরি করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শারমিন্দ নিলোর্মী। এই ফোরামের সদস্য সংস্থাগুলো হচ্ছে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংস্থা, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ, অপফাম ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন। ২০২০ সালে করোনা চলাকালে নভেম্বরে জরিপের কাজ শুরু হয়েছিল, চলেছে জানুয়ারি পর্যন্ত। দেশের ৯টি জেলায় শহরের ও গ্রামের বিভিন্ন পেশা ও বয়সের মধ্যে জরিপটি চালানো হলেও জরিপের পরিপ্রেক্ষিতের কথা ভেবে নারী উত্তরদাতার সংখ্যা বেশি ধরা হয়েছে। উত্তরদাতাদের মধ্যে শতকরা ৮৭ জন নারী, শতকরা ১৩ জন পুরুষ ও শতকরা একজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। তাদের মধ্যে ২১৯ জন গ্রামের ও ২২৪ জন শহরের এবং শতকরা ৫৮ জনের বয়স ৩১ থেকে ৪৫-এর মধ্যে। উত্তরদাতাদের মধ্যে শতকরা ৪৭ ভাগ গৃহিণী। বাকিরা অন্য পেশাজীবী।

উত্তরদাতাদের শতকরা ৮২ দশমিক ৭৮ জন মনে করেন, মহামারি তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলেছে। করোনাকালের অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করেছে মানসিক চাপ এবং শারীরিকভাবে মানুষকে দুর্বল করে তুলেছে। গ্রামীণ নারী উত্তরদাতার মধ্যে অর্ধেকই নিজেদের মানসিকভাবে দুর্বল মনে করছেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, আমাদের দেখতে হবে, এই অনানুষ্ঠানিক কাজকে আমরা কীভাবে জাতীয় ডাটাবেসে সন্নিবেশিত করতে পারি। নারীর এই শ্রমকে আগামী অর্থবছরের এসএনএতে যোগ করতে চাই।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সোকো ইশিকাওয়া বলেন, ইউএন উইম্যান সব সময় এ কাজের সঙ্গে ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। তবে আমাদের ভাবতে হবে নারীর এই কাজকে আমরা কীভাবে দৃশ্যমান করব।

সভাপ্রধানের বক্তব্যে শাহীন আনাম বলেন, নারীর কাজকে দায়িত্ব মনে না করে যেদিন কাজ বলে মনে করতে শিখব, সেদিনই নারীর কাজের মূল্য যোগ হবে।