বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহর ঢাকা দুদিনেই বদলে গেছে। নেই যানবাহন, নেই কালোধোঁয়া। কমে গেছে ধুলোবালিও। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে এক সপ্তাহের লকডাউনের দ্বিতীয় দিনেই রাজধানী ঢাকার বায়ুর গুণগত মান ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। গাড়ি বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকগুণ কমে গেছে বায়ুদূষণ।

বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় ৯৭ স্কোর নিয়ে বাতাসের মান সূচকে (একিউআই) বিশ্বে ২১তম অবস্থানে ছিল রাজধানী ঢাকা। পরিবেশবিদরা বলছেন, আদর্শ পরিবেশ এমনটাই হওয়া উচিত।

বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় নেপালের কাঠমান্ডু, ভারতের নয়াদিল্লি এবং চীনের বেইজিং যথাক্রমে ২০৭, ১৬৮ ও ১৬৭ স্কোর নিয়ে তালিকার প্রথম তিনটি স্থান দখল করে।

গত বছর করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর সাধারণ ছুটি চলাকালে মার্চ ও এপ্রিলে এয়ার ভিজ্যুয়াল- এর দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান ছিল ৩০ থেকে ৪০ নম্বরে। তবে সাধারণ ছুটি শেষ হওয়ার পর ধীরে ধীরে দূষণ বাড়তে থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বের বায়ুমান যাচাইবিষয়ক প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান 'এয়ার ভিজ্যুয়াল' এপ্রিলের প্রথম ৮ দিনের ঢাকার গড় বায়ুদূষণের তথ্য প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা গেছে, আটদিনের মধ্যে ছয়দিনই বায়ুর মান ছিল 'অস্বাস্থ্যকর' (স্কোর ১৫০ থেকে ২০০) এবং বাকি দুই দিন ছিল 'খুবই অস্বাস্থ্যকর' (স্কোর ২০১ থেকে ৩০০)।

একিউআই সূচকে ৫০ এর নিচে স্কোর থাকার অর্থ হলো বাতাসের মান ভালো। স্কোর ৫১ থেকে ১০০ হলে বাতাসের মান গ্রহণযোগ্য বলে ধরে নেওয়া হয়। স্কোর ১০১ থেকে ১৫০ থাকলে সেই বাতাসকে ‘স্পর্শকাতরদের জন্য অস্বাস্থ্যকর’ বিবেচনা করা হয়। আর স্কোক ১৫১ থেকে ২০০ থাকলে তা বিবেচনা করা হয় ‘সবার জন্য অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে। বায়ুর মান ২০১ থেকে ৩০০ পিএম হলে সেটাকে বিবেচনা করা হয় ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, রাজধানীর বাতাসকে বিষিয়ে তুলছে যানবাহনের ধোঁয়া। বায়ুদূষণের জন্য অর্ধেক (৫০%) দায়ই মূলত তরল জ্বালানি পোড়ানোর মাধ্যমে তৈরি হওয়া এই ধোঁয়ার। ৪০ ভাগ দূষণের উৎস খড়, কাঠ, তুষের মতো জৈব বস্তুর ধোঁয়া ও সূক্ষ্ম বস্তুকণা। বাকি ১০ শতাংশ দূষিত বস্তুকণা আসে ইটভাটায় কয়লা পোড়ানোর ধোঁয়া থেকে।

স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) ঢাকা শহরের ৭০টি স্থানের বায়ুদূষণ বিষয়ে সমীক্ষা চালিয়ে গত মার্চে প্রতিবেদনে বলেছে, ঢাকার বাতাসে অতি সূক্ষ্ম বস্তুকণা ২.৫ এর পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি। এটি সাধারণ জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো অর্থাৎ যানবাহন, শিল্পকারখানা ও বর্জ্য পোড়ানো থেকে সৃষ্টি হয়। তবে নির্মাণকাজ হতে সৃষ্ট ধুলাবালি রাস্তার গাড়ির চাকার সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে অতিক্ষুদ্র ধূলিকণায় রূপান্তরিত হতে পারে।

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও বিশ্ববিদ্যালয়টির বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক অধ্যাপক আহ্‌মদ কামরুজ্জামান মজুমদার সমকালকে বলেন, ২০২০ সালের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসের তুলনায় ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ১১ ভাগ, ফেব্রুয়ারিতে ৫ ভাগ এবং মার্চ মাসে ২১ ভাগ বায়ুদূষণ বেড়েছে। ২০১৬ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত চার বছরের তুলনায় ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ৭ ভাগ, ফেব্রুয়ারি মাসে ৮ ভাগ ও মার্চ মাসে ১৮ ভাগ বায়ুদূষণ বেড়েছে। লকডাউন শুরুর পর ১৪ এপ্রিল থেকে দিনের কোনো কোনো সময় স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ৭০ ভাগ বায়ু দষূণ কমেছে, সারাদিনের হিসেবে ৫৫ ভাগ কমেছে।

লকডাউন চলাকালে প্রতিদিন ঢাকার দুটি এলাকায় স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) আট ঘণ্টা করে বায়ুর মান পরিমাপ করছে স্বয়ক্রিয় যন্ত্রের সাহায্যে। বায়ুদূষণ কমার কারণ ব্যাখ্যা করে অধ্যাপক আহ্‌মদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, লকডাউনেও কারখানা ও ইটভাটা খোলা। কিন্তু বায়দূষণ বাড়ানোর তিনটি উৎস এখন বন্ধ। প্রথম উৎস যানবাহন বন্ধ, যা ২০ ভাগ বায়ুদূষণ বাড়ায়। দ্বিতীয় উৎস রাস্তা খোড়াখুড়ি, যা ২০ ভাগ দূষণ বাড়ায়। তৃতীয় উৎস বর্জ্য পোড়ানো, যা ১০ ভাগ দূষণ বাড়ায়। এভাবে ৫০ ভাগ বায়ুদূষণ কমেছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ঢাকায় ১৬ লাখ গাড়ির ভেতরে ৩৩ শতাংশ গাড়ি ফিটনেসবিহীন, যার পরিমাণ ৫ লাখ ৬০ হাজার। ফিটনেসবিহীন গাড়ি বায়ুদূষণ বাড়িয়েছে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি স্বাভাবিক অবস্থায় বন্ধ রাখা, ধুলাবালি বন্ধ ও নিয়ম মেনে নির্মাণ কাজ করা গেলে ঢাকায় বায়ুদূষণ কমানো সম্ভব।

মন্তব্য করুন