কৌশলে তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীকে ধর্ম শিক্ষার নাম করে জঙ্গি কার্যক্রমে ব্যবহার করার উদ্যোগ নিয়েছে উগ্রপন্থি সংগঠন আনসার আল ইসলাম। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া এই জনগোষ্ঠীকে পুনর্বাসনের কথা বলে একত্র করছে উগ্রপন্থিরা। হতাশাগ্রস্ত হওয়ার কারণে এদেরকে সহজে দলে ভেড়ানো সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে। গোয়েন্দা সূত্রে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

সূত্র জানায়, কোরআন-হাদিস ও বাংলা শিক্ষার আড়ালে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকে বাছাই করে সংগঠনে নেওয়া হচ্ছে। জঙ্গিদের এই অভিনব কৌশল জানার পর নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

সূত্রমতে, দেশে যে কয়েকটি উগ্রপন্থি সংগঠন বর্তমানে সক্রিয়, তার মধ্যে আনসার আল ইসলাম অন্যতম। এটি আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বা এবিটি নামে পরিচিত। বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায়, জাগৃতি প্রকাশনীর কর্ণধার ফয়সল আরেফিন দীপন, ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবুসহ অধিকাংশ লেখক, ব্লগার ও মুক্তচিন্তার ব্যক্তির ওপর হামলা করেছে এই সংগঠনের সদস্যরা। তাদের অপারেশনাল কমান্ডার মেজর (বরখাস্ত) সৈয়দ জিয়াউল হক জিয়াকে এখনও ধরা যায়নি। গোয়েন্দাদের আশঙ্কা, যে কোনো সময় আবার ভয়ংকররূপে আবির্ভূত হতে পারে তারা। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, এবিটির হাতে ২০১৫ সালের ৩০ মার্চ তেজগাঁওয়ে ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু হত্যার পরপরই ধাওয়া করে দুই জঙ্গি জিকরুল্লাহ ও আরিফুলকে ধরে ফেলে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। ঘটনাস্থলে এবিটির সদস্যদের হাতেনাতে ধরা পড়ার নজির সেটাই ছিল প্রথম। এরপর এবিটির শীর্ষ জঙ্গিদের মাথায় আসে, এদেরকে ব্যবহার করে যে কোনো ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো সম্ভব। তখনই এ পরিকল্পনা করে তারা।

সূত্রমতে, সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে দু'জন জঙ্গি ধরা পড়ে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তৃতীয় লিঙ্গকে ঘিরে জঙ্গি নেটওয়ার্কের বিষয়টি জানা যায়। ঢাকার অদূরে একটি স্থানে এরই মধ্যে এই জনগোষ্ঠীর সদস্যদের নিয়ে সামাজিক ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমের আড়ালে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

দায়িত্বশীল এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, সংগঠনের জন্য সদস্য সংগ্রহে আরও অনেক কর্মসূচি নিয়েছে জঙ্গিরা। তার মধ্যে রয়েছে নওমুসলিম কার্যক্রম। প্রত্যন্ত এলাকায় মসজিদ ও মাদ্রাসা গড়ে তুলে জঙ্গি মতবাদে দীক্ষা দেওয়া। তাদের আর্থিক সহযোগিতামূলক কার্যক্রম চালু করা। আনসার আল ইসলাম করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সহযোগিতার কথা বলে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ অর্থ সংগ্রহ করছে। সদকা ও জাকাতের কথা বলে প্রবাসী শ্রমিকদের কাছ থেকেও অর্থ নিচ্ছে উগ্রপন্থিরা। এভাবে উগ্রপন্থিরা তহবিল সংগ্রহ করছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন নসিয়া নামে একটি গ্রুপের তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দারা। যেখান থেকে নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডের কথা বলে দান-দক্ষিণা চাওয়া হতো। দেশ-বিদেশ থেকে অনেকে দান করতেন। যদিও ওই গ্রুপ চালাত উগ্রপন্থিরা। এরই মধ্যে এই গ্রুপের অন্যতম অ্যাডমিন মো. ফয়সালসহ দু'জনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেপ্তার করেছে। মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের দুটি মাদ্রাসার একাধিক শিক্ষক নজরদারিতে রয়েছেন, যারা জঙ্গিবাদে সংশ্নিষ্ট বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

সূত্রমতে, সারিকা নামে একজন উত্তরা ও আবদুল্লাহপুর এলাকায় তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীকে নেতৃত্ব দেন। সারিকা সমকালকে জানান, একটি তহবিলের আওতায় কোরআন-হাদিস ও বাংলা শিক্ষা দেওয়া হবে বলে তার কাছে প্রস্তাব এসেছে। আরও অনেকের কাছেও এই প্রস্তাব গেছে। তবে এখনও কোনো প্রকল্পের সঙ্গে তারা যুক্ত হননি।

সূত্রমতে, একই সঙ্গে উগ্রপন্থিদের নতুন আরেকটি পরিকল্পনার কথা বেরিয়ে এসেছে। তা হলো, প্রচলিত মুদ্রার বাইরে ভার্চুয়াল মুদ্রা বিট কয়েনের ব্যবহার। জঙ্গিরা ক্রিপ্টো কারেন্সি পরিকল্পিতভাবে বাজারে এনেছে। এক জঙ্গি গোয়েন্দা জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, গ্লোবাল সুপার পাওয়ার হতে দুটি বিষয় দরকার- এক. সামরিক শক্তি; দুই. অর্থনৈতিক শক্তি। তাদের বিশ্বাস, একসময় ব্রিটিশ মুদ্রা পাউন্ড খুব শক্তিশালী ছিল। বর্তমানে মার্কিন ডলার পৃথিবীতে রাজত্ব করছে। জঙ্গিরা মনে করে, ডলারও একদিন তাদের শক্তি হারাবে। তাই পরিকল্পিতভাবে ক্রিপ্টো কারেন্সির দিকে ঝুঁকছে জঙ্গিরা। বাস্তবে এ ধরনের মুদ্রার কোনো অস্তিত্ব নেই। ইন্টারনেটে প্রোগ্রামিংয়ের মাধ্যমে এটি চাইলে কেনা যায়। ইন্টারনেট সিস্টেমকে ব্যবহার করে কিছু লোক এই মুদ্রার চক্র গড়ে তুলেছে। এটা এক ধরনের জুয়া খেলার মতো। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি তার এক নির্দেশনায় জানায়, ক্রিপ্টো কারেন্সি কোনো দেশের বৈধ কর্তৃপক্ষ ইস্যু করে না। তাই এর বিপরীতে আর্থিক দাবির কোনো স্বীকৃতিও নেই। ক্রিপ্টো কারেন্সির মাধ্যমে লেনদেন মানি লন্ডারিং এবং সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন-সংশ্নিষ্ট আইনের লঙ্ঘন হতে পারে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্ক করে দেয়।

আনসার আল ইসলাম 'হোমগ্রোন' উগ্রপন্থি সংগঠন। তারা আল কায়দার আদর্শ অনুসরণ করে থাকে। সর্বশেষ ২০১৬ সালে ধানমন্ডিতে জোড়া খুনের মধ্য দিয়ে আনসার আল ইসলাম একক হামলা চালালেও ২০১৮ সালের জুনে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে লেখক ও প্রকাশক শাহজাহান বাচ্চুর ঘটনায় তাদের নাম আসে। বাচ্চুর ঘটনার পর দেশে বড় ধরনের কোনো জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেনি। পরে বেরিয়ে আসে- পুরাতন জেএমবি, নব্য জেএমবি ও আনসার আল ইসলামের সদস্যরা একত্র হয়ে ওই হামলা চালায়। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, আপাতত বড় ধরনের হামলার সক্ষমতা কোনো জঙ্গি সংগঠনের না থাকলেও 'উপযুক্ত' পরিবেশ পেলে তারা যে কোনো সময় ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। এ কারণেই আনসার আল ইসলামের মতো সংগঠনের ওপর নজরদারি আরও বাড়ানো প্রয়োজন।