ঈদে ফের গ্রামমুখী মানুষ

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল প্রতিবেদক

নানা দুর্ভোগ মাথায় নিয়ে বাড়ির পথে মানুষ। শুক্রবার মাওয়া ফেরিঘাটে উপচেপড়া ভিড় 	- সমকাল

নানা দুর্ভোগ মাথায় নিয়ে বাড়ির পথে মানুষ। শুক্রবার মাওয়া ফেরিঘাটে উপচেপড়া ভিড় - সমকাল

শুক্রবার দুপুর দেড়টা। রাজধানীর প্রবেশপথ গাবতলীর চেকপোস্টে দেখা গেল পিপিই পরে কয়েকজন পুলিশ সদস্য রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে। প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলে করে ঢাকা ছাড়ছে হাজার হাজার মানুষ।
সড়কে চেকপোস্ট ব্যারিকেড সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। দায়িত্বরত একজন পুলিশ সদস্য জানালেন- বৃহস্পতিবার রাতে তাদের কাছে নির্দেশনা এসেছে চেকপোস্ট খুলে দেওয়ার বিষয়ে। মানুষ ব্যক্তিগত গাড়িতে ঢাকা থেকে বের হতে কোনো বাধা নেই। রাত ১১টার পর চেকপোস্ট খুলে দেওয়া হয়। তবে রাতে ব্যক্তিগত গাড়িতে যাতায়াত কম থাকলেও শুক্রবার সকাল থেকে বেড়েছে। গণপরিবহন চলছে না।
এদিকে করোনা পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিদিনের ব্রিফিংয়ে গতকাল শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, ঈদের ছুটিতে শহর ছেড়ে কেউ গ্রামে যাবেন না। গ্রামে যাওয়ার কারণে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যেতে পারে। যে যেখানে আছেন, সেখানেই অবস্থান করে ঈদ করুন।
এদিকে র‌্যাবের মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন র‌্যাব সদর দপ্তর থেকে গতকাল ভিডিও কনফারেন্সে বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে গ্রামের বাড়িতে ঈদ উদযাপন করতে যাওয়া যাবে। কোনো গণপরিবহন ব্যবহার করা যাবে না। 'করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে ঈদকে কেন্দ্র করে র‌্যাবের ভূমিকা' শীর্ষক মতবিনিময় সভায় তিনি আরও বলেন, জনকল্যাণের বিষয়টি বিবেচনায় করে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিশ্নেষকরা বলছেন, সরকারের সিদ্ধান্তে সমন্বয়হীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দু'দিন আগেই ঈদযাত্রা রুখতে ফেরি বন্ধ করে দেওয়া হলো। সেটি আবার কোন যুক্তিতে খুলে দেওয়া হলো তা বোধগম্য নয়। তারা আরও বলছেন, প্রতিদিন করোনায় সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এরই মধ্যে শিথিল করা হলো ঈদযাত্রা। করোনা পরিস্থিতিতে মানুষের ঈদযাত্রা ঠেকাতে পাটুরিয়া, মাওয়াঘাটে ফেরি চলচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঘাট থেকে মানুষকে বাসে ঢাকায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়। করোনা সংক্রমণ বাড়ার কারণেই সরকার এসব বিধিনিষেধ জারি করেছিল। এটাই সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। যাতে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ এলাকা ঢাকা থেকে মানুষ গ্রামে যেতে না পারে। তাহলে গ্রামে সংক্রমণ রোধ করা যাবে। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত কীভাবে আবার পরিবর্তন হলো তা বোধগম্য নয়।
গত ১৪ মে সর্বশেষ ছুটির আদেশে বলা হয়, 'সাধারণ ছুটি/চলাচলে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে কেউ কর্মস্থল ত্যাগ করতে পারবে না।' ১৭ মে থেকে রাজধানীর প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে চেকপোস্টে কড়াকড়ি করে পুলিশ। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বের হলে মানুষকে পুলিশের বাধার মুখে পড়তে হয়। এরই মধ্যে ঈদযাত্রা শিথিলের বিষয়ে বৃহস্পতিবার রাতে সরকারি নির্দেশনা পৌঁছায় পুলিশের কাছে।
জানতে চাইলে হাইওয়ে পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মল্লিক ফখরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, যারা ঈদে গ্রামের বাড়ি যেতে চান, তারা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় যেতে পারবেন। গণপরিবহন চলবে না। পণ্যবাহী ট্রাকে কোনো যাত্রী যেতে দেওয়া হবে না। ট্রাকে কেউ গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রেন্ট এ কার নিয়ে যেতে পারবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ভাড়া করলেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। একসঙ্গে বেশিজন গাদাগাদি করে যাওয়া যাবে না। তবে একই পরিবারের হলে সমস্যা নেই।
দারুসসালাম জোনের (গাবতলী এলাকা) ট্রাফিক ইন্সপেক্টর হুমায়ুন কবির সমকালকে বলেন, বৃহস্পতিবার রাত ১১টায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছ থেকে নির্দেশনা পেয়ে রাস্তার চেকপোস্ট খুলে দেওয়া হয়।
করোনা পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য জনস্বাস্থ্যবিদদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির প্রধান অধ্যাপক শাহ মনির হোসেন সমকালকে বলেন, সারাদেশে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ঈদে মানুষ ঢাকা ছাড়লে গ্রামাঞ্চলে করোনার ঝুঁকি আরও ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়বে। তাড়াতাড়ি এটা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। করোনা নিয়ন্ত্রণের অন্যতম উপায় লকডাউন। মানুষকে একস্থান থেকে অন্যস্থানে যেতে না দেওয়া। বর্তমান পরিস্থিতিতে নিজস্ব ব্যবস্থাপনাতেও মানুষকে গ্রামে যেতে দেওয়া সিদ্ধান্ত সঠিক হয়নি।
গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে প্রচুর গাড়ি চলাচল করতে দেখা যায়। অনেকে মাইক্রোবাসে করে ছুটছেন গ্রামের দিকে। একজন জানালেন, নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় গ্রামে যেতে বাধা নেই- এ খবর সকালে শুনেই গ্রামের বাড়ি মাগুরার উদ্দেশে বের হয়েছেন।
সরেজমিন দেখা যায়, ব্যক্তিগত গাড়িতে ঈদযাত্রা শিথিলের সুযোগে সিএনজি অটোরিকশা ও রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চলা মোটরসাইকেলে মানুষ আরিচা ও মাওয়া ঘাটে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে যাত্রীপ্রতি ৬-৭শ' টাকা ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। মোটরসাইকেলে দু'জন করে যাত্রী বহন করা হচ্ছে। এ ছাড়া পণ্যবাহী গাড়িতে যাত্রী বহনে বাধানিষেধ থাকলেও মানুষ মানছে না। খালি ট্রাকেও ঢাকা ছাড়ছে মানুষ।
এবার ঈদে গ্রামে যাওয়া ঠেকাতে পুলিশ 'কঠোর' থাকবে- এ কথা জানিয়ে আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ বলেছিলেন, ঈদ উপলক্ষে ও সরকার ঘোষিত বর্ধিত ছুটি উদযাপনের জন্য অনেকেই গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হচ্ছেন। এটি কোনোভাবেই হতে দেওয়া যাবে না। কয়েকদিন আগে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে মাঠ পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে তিনি এ নির্দেশনা দেন।
ডিএমপির একাধিক কর্মকর্তা জানান, পুলিশ সদস্যরা রাস্তায় থাকবেন, কেউ যেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি না ফেরেন, তা নিশ্চিত করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।