পাওয়ার সেলের প্রতিবেদন

করোনায় বিদ্যুতে ক্ষতি হতে পারে ৪০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা

প্রকাশ: ২২ মে ২০২০   

হাসনাইন ইমতিয়াজ

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

করোনার কারণে তিন মাসে (এপ্রিল-জুন) বিদ্যুৎ খাতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২০ হাজার ২২০ কোটি টাকা। করোনাকাল দীর্ঘ হলে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ৪০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। চাহিদা হ্রা পাওয়ায় বিদ্যুৎ বিক্রি কম হওয়ায়, বন্ধ রাখলেও বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর রেন্টাল চার্জ প্রদান, প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধিসহ উৎপাদন, বিতরণ ও সঞ্চালন খাতে এই লোকসান গুণতে হবে বিদ্যুৎ বিভাগকে। কোভিড-১৯ এর কারণে সৃষ্ট বিরূপ পরিস্থিতিতে দেশের বিদ্যুৎ খাতের সম্ভাব্য ক্ষতির এই পরিমাণ বিদ্যুৎ বিভাগের নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এ বিষয়ে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ শুক্রবার সন্ধ্যায় সমকালকে বলেন, করোনার কারণে  বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক ক্ষতি হবে। ক্ষতি পূরণে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ভর্তুকি বাড়ানোর জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া তৃতীয় আরেকটি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে ক্ষতির সার্বিক হিসেব নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। 

বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা আপতত বিনা সুদে ১৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ চেয়েছেন। 

পাওয়ার সেলের প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনার সংক্রমণ রোধে দীর্ঘ প্রায় দুই মাস ধরে সারা দেশে সাধারণ ছুটি চলছে। বিদ্যুতের চাহিদা ও ব্যবহারে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। গ্রীষ্ম কালে বাংলাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। করোনার কারণে সারাদেশে স্কুল-কলেজ, শিল্প, কলকারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, অফিস আদালত বন্ধ থাকায় এবার বিদ্যুতের চাহিদা ব্যাপক ভাবে হ্রাস পেয়েছে। চাহিদা না থাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হচ্ছে। বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তির শর্ত অনুসারে বিদ্যুৎ না কিনলেও নির্ধারিত হারে কাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে।  এ কারণে  করোনা পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সমুখীন হচ্ছে। গ্রাহকদের স্বার্থ বিবেচনা করে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের সময়সীমা সারচার্জ বা জরিমানা ছাড়া জুন মাস পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। করোনা ভাইরাসের কারণে দেশের নিম্ন আয়ের মানুষসহ অধিকাংশ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ায় আবাসিক গ্রাহকসহ শিল্প, বাণিজিরক, সেচের অধিকাংশ গ্রাহক সামনের দিনগুলোতে বকেয়াসহ নিয়মিত বিল পরিশোধে সমর্থ হবে না। এতে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর আয় মারাত্মকভাবে ব্যহত হবে।  ফলে বিতরণ সংস্থা/কোম্পানিগুলো বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড- পিডিবির পাইকারি বিদ্যুতের দাম শোধ করতে পারবে না। এতে পিডিবি বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর (আইপিপি) বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে পারবে না। সার্বিকভাবে বিদ্যুৎ খাত মারাত্মক তারল্য সংকটের সম্মুখীন হবে। এছাড়াও করোনার কারণে বর্তমানে চলমান মেগা প্রকল্পসহ সঞ্চালন ও বিতরণ খাতের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন বিলম্বিত হবে। ফলে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং বিদ্যুৎ খাত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবার গরমে বিদ্যুতের স্বাভাবিক চাহিদা অনেক কমে গেছে। এতে অন্তত চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম উৎপাদন করা হচ্ছে। এর পুরোটাই বেসরকারি কোম্পানির। বসিয়ে রাখা এসব কোম্পানির প্রন্টালভাড়া বাবদ সরকারকে প্রতি মাসে ৬২২ কোটি টাকা দিতে হচ্ছে। এপ্রিল থেকে জুনের তিন মাসে রেন্টাল ভাড়া হিসেবে পরিশোধ করতে হবে এক হাজার ৮০০ কোটি টাকার ওপরে। পরিস্থিতি বিরুপ হলে ডিসেম্বর পর্যন্ত বসিয়ে বসিয়ে বেসরকারি কেন্দ্রগুলোতে গচ্চা যাবে  পাঁচ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা।

প্রতিবেদনের তথ্য মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ হতে পারে এক হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। পরিস্থিতির উন্নতির না হলে ডিসেম্বর পর্যন্ত লোকসান বেড়ে পাঁচ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকায় পৌঁছতে পারে। বিতরণ খাতে জুন পর্যন্ত ক্ষতির সম্ভাব্য পরিমাণ সাত হাজার ৫২০ কোটি টাকা। ডিসেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে ক্ষতির সম্ভাব্য পরিমাণ হতে পারে ১৭ হাজার  ৬৬৬ কোটি টাকা। সঞ্চালন খাতের আর্থিক লোকসান জুন পর্যন্ত এক হাজার ৩২২ কোটি টাকা এবং ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন হাজার ৩২২ কোটি টাকা হতে পারে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে। ট্যারিফ ঘাটতির কারণে লোকসানের পরিমাণ  চার হাজার ৪১১ কোটি টাকা হতে পারে জুন পর্যন্ত, যা ডিসেম্বরে গিয়ে আট হাজার ৮২১ কোটি টাকা হতে পারে। সাধারণ ছুটি ও এলাকা ভিত্তিক লকডাইনের কারণে অনেক উন্নয়ন কাজ বন্ধ রয়েছে। ফলে প্রকল্প বিলম্বিত হবে। এতে ব্যয় বাড়বে। চলতি অর্থ বছরে উন্নয়ন খাতে বিদ্যুৎ বিভাগের ১০৪ টি চলমান প্রকল্পে  ২৬ হাজার ৩৩ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। করোনার কারণে প্রকল্প ব্যয় ২০ শতাংশ বাড়লে চলতি অর্থ ভছরে সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে পাঁচ হাজার ২০৬ কোটি টাকা। 

ক্ষতি উত্তরণে প্রতিবেদনে কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে সরকারের ভর্তুকি অব্যাহত রাখা, সেচের জন্য কৃষককে প্রদেয় ভর্তুকির টাকা কৃষি মন্ত্রণালয়কে না দিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগকে দেওয়া, বিদ্যুৎ বিভাগের সংস্থা ও কোম্পানিগুলোর ঋণের কিস্তি স্থগিত রাখা এবং বিদ্যুৎ বিভাগের অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পের বরাদ্দ ও অর্থ ছাড় অব্যাহত রাখা।