এই যুদ্ধেও জয়ী হবে বাংলাদেশ

তরুণরাই আমাদের শক্তি

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২০     আপডেট: ২৬ মার্চ ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

হাসান আজিজুল হক

গোটা বিশ্বই এখন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। প্রতিদিন সংবাদপত্রে, ঘণ্টায় ঘণ্টায় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর প্রচারিত সংবাদে  যে চিত্র উঠে আসছে, তা যে কোনো সচেতন মানুষকেই উদ্বিগ্ন না করে পারে না। আমাদের উদ্বেগ আরও বেশি। ইতোমধ্যে আমরা শুধু আক্রান্তই হইনি; কয়েকজনের প্রাণহানির মর্মন্তুদ সংবাদও পাওয়া গেছে। সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা-সংগঠন বিদ্যমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় নানা রকম পদক্ষেপ নেওয়া সত্ত্বেও এই ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধ করা কষ্টসাধ্যই মনে হচ্ছে। তবে এ জন্য আমাদের সচেতনতাবোধেরও যে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে, তাও অসত্য নয়। এমন বাস্তবতার মধ্যেই আমরা ৪৯তম স্বাধীনতা দিবস উদ্‌যাপন করতে যাচ্ছি, যদিও বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সব রকম অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অফিস বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আমি মনে করি, বাস্তবতা গোপন না করে বরং তা আমলে রেখে যথাযথ কর্মপন্থা নির্ধারণ করা দরকার। ব্যক্তি থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রেই এমনটি বাঞ্ছনীয়।

আমরা করোনা নিয়েই স্বাধীনতা অর্জনের সুবর্ণজয়ন্তী পালনের দ্বারপ্রান্তে। বিগত প্রায় পাঁচ দশকে আমাদের উন্নয়ন-অগ্রগতির খতিয়ান কম বিস্তৃত নয়। নানা সূচকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের সামনে রয়েছে আশাজাগানিয়া চিত্র। অর্থনৈতিক-সামাজিকসহ আরও অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের অগ্রগতির দৃষ্টান্ত বিশ্বের কোনো কোনো দেশের কাছে অনুসরণযোগ্যও হয়ে উঠেছে। কিন্তু করোনায় আক্রান্ত বিশ্ব তথা আমরা নতুন করে যে ধাক্কাটা খেলাম, এর বিরূপ প্রভাবও হবে সুদূরপ্রসারী। তবুও থেমে থাকলে চলবে না; সম্মিলিত প্রয়াসে এই 'যুদ্ধাবস্থা' মোকাবিলা করে স্বস্তির জায়গা আমাদের বের করতেই হবে।

'যুদ্ধাবস্থা' শব্দটা পেছনের দিকে তাকাতে তাগিদ দিল। একাত্তরে যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও ত্যাগের বিনিময়ে এই জাতিরাষ্ট্র আমরা অর্জন করেছিলাম, সে ক্ষেত্রে বাঙালি জনগোষ্ঠীর তরুণ-যুবক শ্রেণির ভূমিকার অধ্যায়টা স্বর্ণোজ্জ্বল। আজও সেই ভূমিকাই লক্ষ্য করছি সমাজে, যা আশান্বিত করেছে, শক্তি জুগিয়েছে। দেশে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি তরুণ-যুবকদের বড় একটা অংশকে নানা রকম সমাজসেবামূলক কাজসহ জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তাদের উদ্যোগ আমরা লক্ষ্য করছি, যা প্রশংসনীয়। এরাই আমাদের শক্তি। আমি বলতে চাই, আমরা ওদের সহযোগী শক্তি। আমরা আমাদের মত-পরামর্শ দিয়ে ওদের কাজে অনুপ্রেরণা জোগাব, যাতে তারা আরও শক্তি সঞ্চয় করে তাদের ভূমিকা আরও বলিষ্ঠ করার অনুপ্রেরণা পায়।

আমাদের স্বাধীনতা তথা মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ মুক্তিযুদ্ধের সব শহীদকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। যাদের অবদান রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ পর্বে স্তরে স্তরে, তারা বরাবরই আমাদের শ্রদ্ধার পাত্র। সব মুক্তিযোদ্ধাই আমাদের শ্রেষ্ঠ সন্তান। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, তাদের কারও কারও নীতিভ্রষ্ট হওয়ার দৃষ্টান্তও কম পীড়া দেয় না। আমরা জানি, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে নৃশংস গণহত্যার শিকার পূর্ববাংলার আপামর মানুষ যে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং পরবর্তী ৯ মাস যে যুদ্ধ চালিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয় নিশ্চিত করে, তা ছিল প্রকৃত অর্থে সর্বাত্মক জনযুদ্ধ। কারণ সেই যুদ্ধে পুরো জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান ও সাধ্য অনুযায়ী অবদান রেখেছেন। সেই জনযুদ্ধের পর পাঁচ দশক অতিক্রম করার পথে দেশ। স্বাধীনতা দিবসে আমাদের ফিরে দেখা ও আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ আসে। প্রশ্ন দাঁড়ায়- যে স্বপ্ন ও চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম তার কতটা পূরণ হয়েছে। পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে জাতীয় ঐক্য-প্রত্যয়-অঙ্গীকারের যে অভূতপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল ১৯৭১ সালে, তা আমরা ধরে রাখতে পারলাম না কেন? এই জিজ্ঞাসার উত্তরটা সচেতন মানুষমাত্রেই অজানা নয়।

স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনে নেমে এলো ভয়াবহতা। জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করে এক দল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা সদস্যসহ কতিপয় রাজনৈতিক ব্যক্তির সহযোগিতা-চক্রান্তে। তার পর থেকে শুরু হয় উল্টোপথে যাত্রা। স্বাধীনতার পরাজিত শক্তির উত্থান ঘটতে থাকে। ক্রমে ক্রমে নানা অপপ্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় পাল্টে যায় বাহাত্তরের সংবিধানও। পাকিস্তানিদের প্রেতাত্মারা রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার পর্যন্ত হয়। রাজনীতি হয়ে পড়ে পথহারা। হীনস্বার্থবাদীরা তাদের মতো করে, তাদের আদলে সবকিছু চালাতে থাকে। যুদ্ধাপরাধীদের আমরা দুর্ভাগ্যক্রমে দেখতে পেলাম রাষ্ট্রক্ষমতায়; মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের সহযোগিতায়। দীর্ঘদিন পর বদলালো প্রেক্ষাপট। জাতির পিতার হত্যাকারীদের ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়। দণ্ডিত অনেকের চূড়ান্ত দণ্ড কার্যকরও হয়। এখনও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া চলমান। তবে জাতির পিতার হত্যাকারী কেউ কেউ এখনও বিদেশে পলাতক। তাদের ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করে দণ্ড কার্যকরের ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করা দেশ-জাতির বৃহৎ স্বার্থেই জরুরি। কারণ এই বিষবৃত্ত থেকে যতক্ষণ না আমরা মুক্ত হতে পারব ততক্ষণ আমাদের স্বাধীনতার অনেক স্বপ্নই থেকে যাবে অপূর্ণ। একই সঙ্গে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির পথ রুদ্ধ করে বাহাত্তরের সংবিধানের পুনরুজ্জীবনও জরুরি।

মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল গণতন্ত্র ও সামগ্রিক ন্যায়। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিকসহ সর্বক্ষেত্রে সব ধরনের অন্যায়-অবিচার-বৈষম্য থেকে মানুষের মুক্তিও মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার। কিন্তু এখনও আমরা এসব অঙ্গীকারের পূর্ণতা (নানা ক্ষেত্রে অগ্রগতি সত্ত্বেও) দিতে পারিনি। গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পথ আরও মসৃণ করার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি দুর্নীতি ও অপরাজনীতির মূলোৎপাটনে করণীয় কাজগুলো সম্পন্ন করতে হবে নির্মোহ অবস্থান নিয়ে। নির্বাচন ব্যবস্থা প্রশ্নমুক্ত করার অপরিহার্যতার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গণতন্ত্রে নির্বাচন অন্যতম অনুষঙ্গ। এই ব্যবস্থা যদি প্রশ্নমুক্ত করা না যায় তাহলে গণতন্ত্র বিকাশের পথে বাধা থেকেই যাবে।

আমাদের নানা পর্যায়ে দুর্যোগ-দুর্বিপাক মোকাবিলা করে সফলতা অর্জনের অভিজ্ঞতা আছে। তাই আমি নিরাশ হতে চাই না। এই পরিস্থিতিও আমরা কাটিয়ে উঠে এগিয়ে যাব সচেতনতা-সতর্কতা-নিয়মকানুন-বিধিনীতি মান্য করে।

মহাকালের বিচারে ৪৯ বছর কম নয়। এ সময়ের ব্যবধানে কোনো কোনো জাতির অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার নজিরও আছে। আবারও বলি, আজ আমাদের পুনরায় বিচার-বিশ্নেষণ প্রয়োজন- আমরা কতটা এগিয়েছি, কী ছিল আমাদের লক্ষ্য, আর প্রত্যাশাই বা পূরণ হয়েছে কতটা। এই বিশ্নেষণ যদি আমরা নিখুঁতভাবে করতে না পারি তাহলে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ ত্রুটিমুক্ত করতে পারব না। প্রগতিশীল শক্তিগুলোর ঐকমত্য খুব জরুরি। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, মৌলবাদসহ সব ধরনের নেতিবাচকতার চিরঅবসানে এর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

স্বাধীনতা যে কোনো জাতির সবচেয়ে বড় অর্জন। রক্তমূল্যে অর্জিত স্বাধীনতার ক্ষেত্রে তা তো আরও বড় বেশি প্রাসঙ্গিক। আমাদের স্বাধীনতা অর্জন এ জন্যই ভিন্নভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজন থেকে যায়। বাঙালির হাজার হাজার বছরের ইতিহাসে স্বাধীন জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশকে সবচেয়ে উজ্জ্বল ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সুখী ও সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রয়াস হোক নিরন্তর। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নও ছিল তাই।

শুভবুদ্ধির সব হাত একত্রিত হোক। জয় হোক মানবতার। কল্যাণবাদী চিন্তা ও কর্মধারা পুষ্ট হোক। রক্তস্নাত বাংলাদেশই আমাদের বড় অর্জন।

শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক