আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির উদ্যোগ থমকে আছে

প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

আবু সালেহ রনি

একাত্তরের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত ও নৃশংস গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের তৎপরতা থমকে আছে। ২০১৭ সালে জাতীয় সংসদে গণহত্যা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরপরই আন্তর্জাতিকভাবে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি গণহত্যার স্বীকৃতি আদায়ের প্রস্তাব জাতিসংঘে উত্থাপনের ঘোষণা দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীসহ সরকারের অনেক শীর্ষ নেতা। তবে গত তিন বছরেও এ ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি ঘটেনি।
এরই মধ্যে আজ বুধবার চতুর্থবারের মতো দেশব্যাপী জাতীয়ভাবে পালিত হচ্ছে গণহত্যা দিবস। যদিও করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি থাকায় এবার এ দিবসের কর্মসূচি সীমিত করা হয়েছে।
২০১৭ সালের ১১ মার্চ সংসদে ২৫ মার্চকে 'গণহত্যা দিবস' ঘোষণার বিষয়টি সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। এর পর ওই বছরের মার্চেই জাতিসংঘে গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের প্রস্তাব উত্থাপনের ঘোষণা দেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীসহ অনেকেই। অবশ্য জাতিসংঘের ঘোষণা অনুসারে ২০১৫ সাল থেকে ৯ ডিসেম্বর বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস পালিত হয়ে আসছে।
বাংলাদেশের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অগ্রগতি জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক সমকালকে বলেন, 'জাতিসংঘের উদ্যোগে বর্তমানে ৯ ডিসেম্বর বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস পালিত হচ্ছে। এ জন্য বাংলাদেশের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের বিষয়টি নিয়ে কিছু জটিলতা দেখা দিয়েছে। স্বীকৃতি আদায়ের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও এখনও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।' শিগগিরই স্বীকৃতি আদায়ের জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আর্কষণ করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
অবশ্য গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে মন্ত্রী ও সরকারের বক্তব্য 'রাজনৈতিক' বলে মন্তব্য করে গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘরের সভাপতি অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন, 'রাজনীতিবিদরা যেসব কথা বলেন তার অধিকাংশই কথার কথা; রাজনৈতিক। গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির বিষয়টিও সে জন্য এখনও থমকে আছে। কারণ এই স্বীকৃতি শুধু আমলা দিয়ে হওয়ার কথা নয়। এ জন্য প্রয়োজন যারা গণহত্যা নিয়ে কাজ করেন তাদের সম্পৃক্ত করা। সরকার তৎপর থাকলে সংশ্নিষ্ট বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হতো। কিন্তু এমন কোনোকিছু গত তিন বছরে দেখিনি।'
গণহত্যার স্মৃতি সংরক্ষণে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ২০১৪ সালের ১৭ মে খুলনায় প্রতিষ্ঠিত হয় গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর। গণহত্যার ইতিহাস ও তথ্য সংরক্ষণে এই জাদুঘরের ভূমিকা তুলে ধরে মুনতাসীর মামুন বলেন, আমরা গণহত্যা নিয়ে গত তিন বছরে আন্তর্জাতিক সম্মেলন, গবেষণাসহ নানা কাজ করছি, যা এখনও অব্যাহত আছে। আমরা বাংলাদেশের গণহত্যার মানচিত্র ডিজিটাল পদ্ধতিতে বৃহৎ পরিসরে করেছি। এটি ওয়েবসাইটেও পাওয়া যাচ্ছে। আইসিটি মন্ত্রীও বলেছেন, গুগলের মাধ্যমে এটি সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দেবেন। এটি হলে বাংলাদেশের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের কাজ অনেকটাই এগিয়ে যাবে। মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার বিষয় ডিজিটালাইজড হলে ইতিহাস রক্ষার কাজ আরও সুসংহত হবে।
গত কয়েক দশকে মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের জন্য মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিসহ বিভিন্ন সংগঠন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে দাবি জানিয়ে আসছে। ২০০৭ সালে প্রথম জাতিসংঘে ২৫ মার্চকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবসের স্বীকৃতি চেয়ে চিঠি দেয় একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। ২০১৫ সালের মার্চে জাতিসংঘ থেকে গণহত্যা সংক্রাল্পত তথ্য-উপাত্ত চাওয়ার পাশাপাশি জানতে চাওয়া হয়, বাংলাদেশে দিবসটি কীভাবে পালন করা হয়। নির্মূল কমিটির পক্ষ থেকে তখন জাতিসংঘের সংশ্নিষ্ট দপ্তরকে জানানো হয়, বাংলাদেশে এখনও দিবসটি ঘোষণা হয়নি। তবে বিভিন্ন সংগঠন ও সাধারণ মানুষ গণহত্যার শহীদদের স্মরণে নানা কর্মসূচি পালন করে থাকে। এর পরপরই জাতিসংঘ সে বছর ৯ ডিসেম্বরকে 'গণহত্যা দিবস' হিসেবে ঘোষণা করে। এ জন্য সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতার অভাবকেই দায়ী করেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির।
শাহরিয়ার কবির সমকালকে বলেন, সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা থাকলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় নিয়ে জটিলতা হতো না। তবে এখনও সরকার সচেষ্ট হলে মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যার স্বীকৃতি আদায় করা সম্ভব। কারণ একাত্তরে পাকিস্তানি বর্বরতার বিষয়টি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, আর্জেন্টিনা, হংকং, পোল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত। একাধিক বিদেশি গবেষকও একাত্তরের গণহত্যা নিয়ে গবেষণা করছেন। দেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে 'সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ' নামে একটি কোর্সও চালু করা হয়েছে। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরও বছরব্যাপী গণহত্যাবিষয়ক বিভিন্ন ধরনের সংক্ষিপ্ত কোর্স ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করে থাকে।
বিশ্বব্যাপী উনিশ শতক থেকে সংঘটিত নৃশংস গণহত্যাগুলোর মধ্যে আর্মেনীয় গণহত্যা, হলোকাস্ট, নানকিং, কম্বোডীয় ও বসনীয় গণহত্যা, একাত্তরের ২৫ মার্চ বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের 'অপারেশন সার্চলাইট' শীর্ষক পরিকল্পিত গণহত্যা, বেলজিয়ামের রাজা লিওপোল্ডের গণহত্যা এবং সর্বশেষ মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গণহত্যা উল্লেখযোগ্য। তবে এর মধ্যে বাংলাদেশে একাত্তরের ২৫ মার্চ থেকে পরিচালিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত গণহত্যা জঘন্যতম। কারণ ওই এক রাতেই প্রায় ৫০ হাজার বাঙালিকে গুলি করে হত্যা করেছিল পাকিস্তানি বাহিনী।