সংসদীয় কমিটিতে আইন লঙ্ঘন

আইনসভার পৃথক সত্তা হারিয়ে যাচ্ছে সরকারে

প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯     আপডেট: ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ

মসিউর রহমান খান

সুনির্দিষ্ট কার্যপরিধি নির্ধারণ করা সত্ত্বেও সংসদীয় কমিটির কার্যক্রম চলছে উদ্দেশ্যহীনভাবে। মন্ত্রণালয়ের কাজের পর্যালোচনা ও তদারকি সংসদীয় কমিটির কাজ হলেও তাতে আগ্রহ নেই সদস্যদের। একাধিক কমিটির কার্যক্রম চলছে আইন লঙ্ঘন করে। মূল কমিটির বৈঠক থেকে সময় বেঁধে দিয়ে সাব-কমিটি গঠন করা হলেও মাসের পর মাস পেরিয়ে যাচ্ছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে সাব-কমিটি গঠন করা হলেও তাদের সময় ও কাজ কী, তা স্পষ্ট নয়। তবে আইনে বলা আছে, সময় ও কার্যপরিধি নির্ধারণ করেই সাব-কমিটি গঠন করতে হবে। বিশ্নেষকদের মতে, সংসদীয় কমিটির কার্যক্রম পর্যালোচনায় মনে হচ্ছে, তারা নিজেদের নির্বাহী বিভাগের অংশ মনে করছেন। জাতীয় আলোচিত ইস্যুতে মন্ত্রীর পরিবর্তে সংশ্নিষ্ট সংসদীয় কমিটির সভাপতি বা সদস্যরাই সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করছেন। ফলে আইনসভা তার পৃথক সত্তা হারিয়ে সরকারে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

এদিকে কমিটির সদস্যরা বলছেন, তারা অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে কাজ করছেন। অনেক সময় মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পের কাজ পরিদর্শনে ঢাকার বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। সেখানে সাব-কমিটির আসা-যাওয়ার খরচ মন্ত্রণালয় বহন করতে রাজি হয় না। তবে অনেক সদস্যই মনে করেন, নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে একাত্ম হয়ে সংসদ সদস্যরা কাজ করায় দোষের কিছু নেই। জনগণের স্বার্থে সমন্বয় করে কাজ করাটাই শ্রেয়।

গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয় একাদশ সংসদ। সংসদের প্রথম বৈঠকেই প্রায় সব সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়। বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সরকারি হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিসহ একাধিক কমিটির সভাপতি করা হয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সদস্যদের। কিন্তু সংসদ অধিবেশনের মতোই কমিটির কার্যক্রমও চলছে একতরফাভাবে। হাতেগোনা কয়েকটি কমিটি সক্রিয় থাকলেও বেশিরভাগ কমিটির বৈঠক শুধুই আনুষ্ঠানিকতাসম্পন্ন। আইনে মাসে নূ্যনতম একটি সভা করার কথা বলা হলেও অনেক কমিটি গত এক বছরে একটি বৈঠকেও বসেনি।

সংবিধান ও আইনে যা আছে: সংবিধানে কমিটির ক্ষমতা ও কার্যাবলি সম্পর্কে বলা আছে, খসড়া বিল ও অন্যান্য আইনগত প্রস্তাব পরীক্ষা করতে পারবে; আইনের প্রয়োগের পর্যালোচনা এবং প্রয়োগের ব্যবস্থা নিতে প্রস্তাব করতে পারবে; সংসদ কোনো বিষয়ে কমিটিকে অবহিত করলে সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের কাজ অনুসন্ধান ও তদন্ত করতে পারবে। এ ছাড়া সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে প্রতিটি কমিটির কাজের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।

সুনির্দিষ্ট কাজ ছাড়াই সাব-কমিটি গঠন: কার্যপ্রণালি বিধিতে বলা আছে, সংসদীয় মূল স্থায়ী কমিটি এক বা একাধিক সাব-কমিটি গঠন করতে পারবে। তবে সাব-কমিটি কী পরীক্ষা করবে, তা পরিস্কারভাবে উল্লেখ করতে হবে। কিন্তু গত ২৯ আগস্ট মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি দুটি সাব-কমিটি গঠন করে। দুই কমিটিরই আহ্বায়ক হয়েছেন কমিটির সভাপতি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু। একইভাবে দুই কমিটির সদস্য রাখা হয়েছে ছোট মনির, নাজমা আকতার, শামীম আক্তার খানম ও কানিজ ফাতেমা আহমেদকে। তবে সাব-কমিটি কী পরীক্ষা করবে, তা উল্লেখ নেই। ওই বৈঠকের সদস্য মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খান খসরু সাব-কমিটি গঠনের কারণ জানতে চান। সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া সাব-কমিটি গঠনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। জবাবে কমিটির সভাপতি বৈঠকে বলেন, মন্ত্রণালয়ের কাজের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি নিশ্চিত ও গতিশীলতা আনতে সাব-কমিটি গঠন প্রয়োজন। সাব-কমিটি গঠন নিয়ে বিতর্কের সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এভাবে সাব-কমিটি গঠন কার্যপ্রণালি বিধির লঙ্ঘন কি-না, জানতে চাইলে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, এভাবে হওয়ার কথা নয়। তবে তিনি এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক মন্তব্য না করে আইন পর্যালোচনা করে পরে বক্তব্য দেবেন বলে জানান।

এ বিষয়ে কমিটির সভাপতি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু বলেন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বড় মন্ত্রণালয়। সংসদীয় কমিটির বৈঠকে বেশি সময় পাওয়া যায় না। সব সদস্য অংশ নিতেও পারেন না। এ জন্য সাব-কমিটি করে দুটি ভাগে ভাগ হয়ে একটি মৎস্য আর একটি প্রাণিসম্পদ নিয়ে কাজ করবে। তাদের কাজকর্ম দেখা হবে; পরিকল্পনা করা হবে।

সাব-কমিটির খরচ আসবে কোথা থেকে: এর আগে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সাব-কমিটির পক্ষ থেকে চট্টগ্রামে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের জমিতে 'টাওয়ার-৭১' ২৯ তলা ভবন এবং 'জয় বাংলা' ১৯ তলা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের কাজ পরিদর্শনে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সাব-কমিটির আহ্বায়ক কাজী ফিরোজ রশীদ নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করার যুক্তি হিসেবে বলেন, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে তিনি কারিগরি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে নির্মাণাধীন এলাকায় যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। কিন্তু আসা-যাওয়ার খরচ কে বহন করবে, তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি বলে নির্দিষ্ট সময়ে যেতে পারেননি। গাঁটের পয়সা খরচ করে যেতে তিনি রাজি নন বলেও মন্তব্য করেন।

তবে এ সমস্যা বিষয়ে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, আইন অনুযায়ী স্পিকারের অনুমতি নিয়ে সংসদের বাইরেও কমিটি সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। অনেক কমিটি এ ধরনের বৈঠক করেছে। তবে সাব-কমিটির ক্ষেত্রে কী ধরনের সুযোগ রয়েছে, তা আইনি ব্যাখ্যার বিষয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এক বৈঠকে দুই সভা: একই দিনে, একই সময়ে, একই স্থানে একটি বৈঠক হলেও কাগজপত্রে দুটি সভা করছে সরকারি হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। মাসে নূ্যনতম একটি সভার কথা আইনে বলা হলেও বৈঠকের 'সংখ্যা বাড়াতে' এমনটি করা হচ্ছে বলে সংসদের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই কমিটির সভাপতি বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সদস্য রুস্তম আলী ফরাজী। তিনি অবশ্য দাবি করেছেন, নিরীক্ষা আপত্তি পর্যালোচনা করে দ্রুত নিষ্পত্তি করে অর্থবছরের সঙ্গে সমানতালে চলার জন্যই বেশি বেশি বৈঠক করছেন।

সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানান, কমিটির অষ্টম ও নবম বৈঠক গত ৫ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টায় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত হয়। দশম ও এগারোতম বৈঠক ১৯ সেপ্টেম্বর একই সময়ে সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত হয়। দশম সংসদে এই কমিটির সভাপতি ছিলেন আওয়ামী লীগদলীয় এমপি ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর। ওই কমিটি পাঁচ বছরে ১০৮টি বৈঠক করে, যা ছিল ওই সংসদের সর্বোচ্চ। গতবারের ধারাবাহিকতায় এবারও সরকারি হিসাব কমিটি একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে। যদিও টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান সংখ্যা বাড়ানোর এই তৎপরতাকে অপ্রত্যাশিত বলে মন্তব্য করেছেন। তবে স্পিকার শিরীন শারমিন বলেছেন, এতে আইনের ব্যত্যয় ঘটেনি।

কমিটির সভাপতি রুস্তম আলী ফরাজী বলেছেন, ব্যক্তিগতভাবে তিনি ব্যস্ত না থাকলেও কমিটির সদস্যদের আরও ব্যস্ততা রয়েছে। তারা বারবার আসতে পারেন না। এ কারণে একাধিক বৈঠক করা হচ্ছে। কমিটির সদস্য ওয়াসিকা আয়শা খান বলেন, গতিশীলতার জন্যই দুটি করে বৈঠক করা হচ্ছে। এতে কমিটির বৈঠকের সংখ্যা বাড়ছে। এটা ভালো দিক।

শুধু সরকারি হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিই নয়; এর আগে দশম সংসদের কমিটিগুলোর মতোই চলছে অন্য কমিটিগুলোর এবারের কার্যক্রম। গবেষণা সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশ (টিআইবি) সম্প্রতি দশম সংসদ নিয়ে তাদের 'পার্লামেন্ট ওয়াচ' শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে সংসদীয় কমিটির কার্যক্রম নিয়ে যেসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়, তার খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জমান বলেন, রাষ্ট্রের একটি পৃথক সত্তা আইনসভা। তার অস্তিত্ব শুধু কাগজে-কলমে থাকলে চলবে না। সংসদীয় কমিটির কাজ মন্ত্রণালয়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। কমিটি সভাপতিরাই যদি মন্ত্রীর হয়ে বক্তব্য দেন, তাহলে কমিটি থাকার কী প্রয়োজন? তিনি আরও বলেন, সুনির্দিষ্ট কার্যসূচি এবং সময় নির্ধারণ না করে সাব-কমিটি গঠন কার্যপ্রণালি বিধির লঙ্ঘন। তবে এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে সংশ্নিষ্টরাই ভালো বলতে পারবেন।