ফরিদপুর মেডিকেল কলেজে কেনাকাটায় দুর্নীতি: পুকুরচুরি বলছে সংসদীয় কমিটি

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০১৯   

 সমকাল প্রতিবেদক

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের যন্ত্রপাতি ক্রয়ে অনিয়ম আর দুর্নীতির মহোৎসব হয়েছে। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের এক বছর আগেই দরপত্র খোলার সময় দেখানো হয়। দরপত্রের তালিকায় যেসব যন্ত্রপাতি উল্লেখ করা হয়েছে, ক্রয়কৃত যন্ত্রপাতির সঙ্গে তার মিল নেই। এমনকি এসব কেনাকাটায় সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত (পিপিআর) নির্দেশনাও মানা হয়নি। পরিস্থিতি বিশ্নেষণ করে সংসদীয় কমিটি বলেছে- এটা বড় ধরনের পুকুরচুরি। ঘটনা তদন্তে সংসদীয় উপ-কমিটি গঠন করা হয়েছে।

বুধবার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

কমিটির সভাপতি শেখ ফজলুল করিম সেলিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সদস্য আ ফ ম রুহুল হক, মুহিবুর রহমান মানিক, মনসুর রহমান, আব্দুল আজিজ ও সৈয়দা জাকিয়া নূর অংশ নেন।

বৈঠক শেষে মুহিবুর রহমান মানিক সাংবাদিকদের বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে ফরিদপুর মেডিকেলে দুর্নীতির বিষয়ে একটি প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে অনিয়মের যেসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে বাস্তবে আরও বেশি অনিয়ম হয়েছে।

বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে তিন পৃষ্ঠার এক প্রতিবেদন দেওয়া হয়। এতে দরপত্র আহ্বান থেকে শুরু করে যন্ত্রপাতি সরবরাহ পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি ও অনিয়মগুলো তুলে ধরা হয়েছে। যন্ত্রপাতি ক্রয়ের একটি দরপত্রের বিষয়ে বলা হয়েছে, ইংরেজি দৈনিক নিউনেশন পত্রিকায় ২০১৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তিতে ওই দরপত্র খোলার সময় দেওয়া হয়েছে তার এক বছর আগে ২০১৩ সালের ২৮ অক্টোবর। এতে ওই টেন্ডারের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ করে মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে একে অবাস্তব ও অগ্রহণযোগ্য বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। রাজস্ব খাতে যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় একই বিজ্ঞপ্তিতে দুটি অর্থবছরের যন্ত্রপাতি কেনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এই ঘটনাকে পিপিআর পরিপন্থি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয়ের স্মারকে একটি কোড থেকে ব্যয়ের জন্য অর্থ ছাড় দেওয়া হলেও অন্য কোডে ওই অর্থ খরচ করা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, সরবরাহকৃত যন্ত্রপাতির ছবি ই-মেইলের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দুটি বিলের মাধ্যমে ১০টি আইটেমের বিপরীতে ১০ কোটি টাকার যে বিল দাবি করা হয়েছে তা বাস্তবসম্মত নয়। 'থ্রি হেড কার্ডিয়াক স্টেথিস্কোপ (জিআই)' ইউনিটের মূল্য এক লাখ ১১ হাজার ৫০০ টাকা, যা বাস্তবসম্মত নয়। বাজারদর যাচাই না করেই চড়ামূল্য দাখিল করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। দরপত্রে কমিটিতে উপস্থিত সদস্যদের সই ছিল না। দরপত্রে অংশ নেওয়া তিন দরদাতার মধ্যে দুটির মালিক একই ব্যক্তি। মেডিকেল সার্জিক্যাল রিকুইজিট (এমএসআর) সামগ্রী কেনার জন্য দরপত্রের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও তা না কিনে অন্য যন্ত্র কেনা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী দুই কোটি টাকার ওপরে কেনাকাটার জন্য সচিবের অনুমতি নেওয়ার কথা থাকলেও ১০ কোটি টাকার কেনাকাটার ক্ষেত্রেও তা নেওয়া হয়নি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, উন্নয়ন খাতের ৩০ কোটি টাকার বিপরীতে ২০ কোটি ৬৩ লাখ ৩৪ হাজার টাকার কার্যাদেশে বিভিন্ন যন্ত্রপাতির মধ্যে সবচেয়ে দামি আইটেম হিসেবে 'ইরিডিয়াম ১৯২ গ্রেড থেরাপি' যন্ত্রের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। যন্ত্রটি ক্যান্সারের থেরাপির কাজে ব্যবহূত হয়। তবে পিপি, কার্যাদেশ ও চুক্তিতে ওই নামের কোনো যন্ত্র পাওয়া যায়নি। দরপত্রের সঙ্গে যে ক্যাটালগ এবং বাপ সরবরাহ করা হয়েছে তার মধ্যে যে যন্ত্রটি সংরক্ষিত আছে, তার বৈজ্ঞানিক নাম হলো ব্রোকি থেরাপি এবং এর পরিবর্তে যে যন্ত্রটি সরবরাহ করা হয়েছে সেটি যন্ত্র নয়। সেটি রেডিও অ্যাক্টিভিটিস আইসটে ইরিডিয়াম ১৯২ গ্রেড সোর্স নামে স্বীকৃত। অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের আগেই অত্যধিক মূল্যের আইসিইউ যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

মুহিবুর রহমান মানিককে সংসদীয় উপ-কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক, আব্দুল আজিজ ও জাকিয়া নূর।