প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ক্ষুব্ধ

বেতন বাড়ানোর প্রস্তাবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের 'না'

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সাব্বির নেওয়াজ

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন বাড়ানোর প্রস্তাবে 'না' করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক- এ দুই পদে বেতন বাড়াতে প্রস্তাব দিয়েছিল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে তাতে সায় দেয়নি অর্থ মন্ত্রণালয়। প্রস্তাব নাকচ হওয়ায় সারাদেশের শিক্ষকরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। এরই মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষকদের সংগঠনগুলো আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করবে বলে জানিয়েছে।

গত রোববার ৮ সেপ্টেম্বর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আকরাম আল হোসেনকে পাঠানো অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সাদিয়া শারমিন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে সরকারের এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। চিঠিতে বলা হয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক পদে বেতন গ্রেড যথাযথ ও সঠিক থাকায় প্রধান শিক্ষক পদের বেতন গ্রেড-১০ ও সহকারী শিক্ষক পদের বেতন গ্রেড-১২-তে উন্নীত করার সুযোগ নেই।

অর্থ মন্ত্রণালয়ে গত ২৯ জুলাই বেতন বাড়ানোর এ প্রস্তাব পাঠিয়েছিল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রাথমিক শিক্ষকদের দীর্ঘ আন্দোলনের পর গ্রেড পরিবর্তনের এ প্রস্তাব করা হয়। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারেও প্রাথমিক শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা ও জীবনমান উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবে গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষকদের প্রত্যাশা অনুযায়ী বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব না দেওয়ায় শিক্ষকদের মধ্যে আগে থেকেই হতাশা রয়েছে। সরকারের ঘোষণা সেই হতাশাকে আরও ঘনীভূত করেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৫ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তার পদমর্যাদা দিলেও তারা জাতীয় বেতন স্কেলের ১১তম গ্রেডে বেতন পাচ্ছেন। অথচ দ্বিতীয় শ্রেণির অন্য সব দপ্তরের কর্মকর্তারা বেতন পান দশম গ্রেডে। তাদের দশম গ্রেডে উন্নীত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সহকারী শিক্ষকরা পান ১৪তম গ্রেডে বেতন। প্রস্তাব করা হয়েছিল, তারা ১২তম গ্রেডে উন্নীত হবেন।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব গতকাল বুধবার তার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন সম্মানজনক গ্রেডে নেওয়া। আগে প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে সহকারী শিক্ষকদের বেতনের পার্থক্য ছিল এক গ্রেড। প্রধান শিক্ষকদের পদমর্যাদা দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তার সমান করায় এখন সে পার্থক্য দাঁড়িয়েছে তিন গ্রেড। এটি নিঃসেন্দেহে বৈষম্য। এ বৈষম্য কমানোর লক্ষ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব করা হয়েছিল।

বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব নাকচ হওয়ায় সারাদেশের শিক্ষকদের ক্ষোভ-বিক্ষোভ প্রসঙ্গে সচিব বলেন, এটি শিক্ষকদের ব্যাপার। এখন বেশিরভাগ শিক্ষকই স্নাতক পাস। প্রাথমিক শিক্ষকদের নূ্যনতম শিক্ষাগত যোগ্যতাও নির্ধারণ করা হয়েছে স্নাতক পাস। এ বিষয়ে গেজেটও জারি করা হয়েছে। সঙ্গত কারণেই অন্যান্য সরকারি চাকরিতে স্নাতক উত্তীর্ণদের জন্য যে বেতন স্কেল নির্ধারণ করা হয়েছে; প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতনও তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়া দরকার।

আকরাম আল হোসেন বলেন, শিক্ষকদের বেতন বাড়ানোর জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে আবারও প্রস্তাব দেব। এরই মধ্যে অর্থ সচিবের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তিনি দেশের বাইরে থেকে ফিরলে আগামী ২০ সেপ্টেম্বরের পর যে কোনোদিন দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে এ বিষয়ে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বর্তমানে সারাদেশে ৬৫ হাজার ৯০২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এগুলোতে তিন লাখ ২৫ হাজার সহকারী শিক্ষক ও ৪২ হাজার প্রধান শিক্ষক রয়েছেন। প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য আছে এমন বিদ্যালয়গুলোতে চলতি দায়িত্ব দিয়ে চালানো হচ্ছে। এ বছর বেতন বাড়লে সহকারী ও প্রধান শিক্ষক- সব মিলিয়ে প্রায় পৌনে চার লাখ শিক্ষক এর সুবিধা পাবেন।

প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক পদাধিকারী সবার মধ্যেই বেতন নিয়ে অসন্তুষ্টি রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. শামছুদ্দিন মাসুদ সমকালকে বলেন, পদ অনুযায়ী প্রধান শিক্ষকদের নিচের ধাপে সহকারী শিক্ষকদের অবস্থান। অথচ প্রধান শিক্ষকদের বেতন স্কেল ১১তম গ্রেডে হলেও সহকারী শিক্ষকদের বেতন ১৪তম গ্রেডে হয়। এটি বৈষম্য। তাই তারা প্রধান শিক্ষকদের বেতন ১০তম গ্রেডে নিয়ে তাদের বেতন গ্রেড ১১তম ধাপে নির্ধারণ করার দাবি জানিয়ে আসছেন।

মো. শামছুদ্দিন মাসুদ বলেন, গত ছয় বছর ধরে তারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য নিরসনের দাবি জানিয়ে আসছেন। অথচ তাদের দাবি পূরণ হচ্ছে না। বরং মন্ত্রণালয় প্রধান শিক্ষকদের ১০ম গ্রেড ও সহকারী শিক্ষকদের ১২তম গ্রেডে বেতন নির্ধারণের প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে সহকারী শিক্ষকদের সঙ্গে বৈষম্য আরও বাড়াতে চেয়েছিল। অর্থ মন্ত্রণালয় সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় যে 'নখদন্তহীন বাঘ'- তা প্রমাণ করে দিল। শামসুদ্দিন মাসুদ বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারের যথাযথ বাস্তবায়নে এখন প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

সিলেটের নশিওরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক সমিতির সিলেট জেলা শাখার সভাপতি প্রমথেশ দত্ত বলেন, বঙ্গবন্ধু প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের সমান গ্রেডে বেতন দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর দেওয়া এই বেতন গ্রেডের বাস্তবায়ন চাই। কুমিল্লা সিটির গুলবাগিচা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আবদুল হালিম ভূঁঁঞা জানান, ১১তম গ্রেড তাদের ন্যায্য দাবি। তারা আশা করছেন, প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনী ইশতেহার মাথায় রেখে বৈষম্য দূর করবেন।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জাতীয় বেতন স্কেলের ১১তম গ্রেডে (১২,৫০০/-) এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকরা ১৪তম গ্রেডে (১০,২০০/-) টাকা পান। ১৬ বছর চাকরির পর একজন প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে সহকারী শিক্ষকের বেতনের ব্যবধান দাঁড়ায় ভাতাসহ প্রায় ২০ হাজার টাকা। শিক্ষক নেতা শামছুদ্দিন মাসুদ বলেন, বর্তমানে একজন প্রধান শিক্ষক যে স্কেলে চাকরি শুরু করেন, একজন সহকারী শিক্ষক সেই স্কেলের এক গ্রেড নিচে চাকরি শেষ করেন, যা সহকারী শিক্ষকদের জন্য চরম বৈষম্য। তিনি বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের সমমানের শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন অন্য ডিপার্টমেন্টের সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন গ্রেডও তাদের তুলনায় তিন থেকে চার ধাপ ওপরে। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে শিক্ষকদের চেয়ে কম শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও অন্য ডিপার্টমেন্টের চাকরিজীবীরা বেশি বেতনে চাকরি করেন। শিক্ষকরা চান সম্মানজনক বেতন স্কেল, যা সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

১৯৬৯ সালে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক উভয়েই ১৩৫ টাকা বেতন পেতেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণের পর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের মধ্যে বেতনের কোনো ব্যবধান ছিল না। তবে প্রধান শিক্ষকরা কার্যভার ভাতা হিসাবে ১০ টাকা বেশি পেতেন। ১৯৭৭ সালে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বেতন পেতেন ১৫তম গ্রেডে ৩২৫ টাকা। তখন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক পেতেন ১৬তম গ্রেডে ৩০০ টাকা। প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের মধ্যে গ্রেডের ব্যবধান ছিল ১ ধাপ। ১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ১৬তম গ্রেডে ৭৫০ টাকা এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক ১৭তম গ্রেডে ৬৫০ টাকা বেতন পেতেন।। ২০০৬ সাল পর্যন্ত একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ১৬তম গ্রেডে ৩,১০০ টাকা এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক ১৭তম গ্রেডে ৩,০০০ টাকা বেতন পেতেন। অর্থাৎ ব্যবধান ১০০ টাকাই ছিল।

কিন্তু ২০০৬ সালের ২৯ আগস্ট বেতন আপগ্রেডের নামে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের ১৩তম গ্রেডে ৩,৫০০ টাকা এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকদের ১৫তম গ্রেডে ৩,১০০ টাকা বেতন নির্ধারণ করা হয়। এই সময় ২ ধাপ বেতন বৈষম্যের সৃষ্টি হয় এবং ব্যবধান দাঁড়ায় ৪০০ টাকা। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন ও পদমর্যাদা বাড়ানোর ঘোষণা দেন। তখন বেতন স্কেল নির্ধারণ করা হয় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের জন্য ২য় শ্রেণির পদমর্যাদাসহ ১১তম গ্রেডে ৬,৪০০ টাকা এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকের জন্য ৩য় শ্রেণির কর্মচারীর পদমর্যাদাসহ ১৪তম গ্রেডে ৫,২০০ টাকা। বেতন গ্রেডের পার্থক্য দাঁড়ায় তিন ধাপ। ৩য় শ্রেণি থেকে প্রধান শিক্ষকরা ২য় শ্রেণিতে উন্নীত হলেও সহকারী শিক্ষকরা ৩য় শ্রেণির পদেই থেকে যান। বেতন আপগ্রেডের সময় মূল বেতনের ব্যবধান হয় ১২০০ টাকা। ২০১৫ সালের অষ্টম জাতীয় পে স্কেলে এ ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ২৩০০ টাকা।

বিষয় : বেতন