নীল আকাশ, নীল জল, নীল দুপুর, নীল পরী, নীল চোখ। নীল দিগন্ত, সুনীল সমুদ্রের মতো অনেক প্রাকৃতিক রঙ মানুষের আবেগ-ভালোবাসার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। অনেকেই প্রেয়সীকে নীল শাড়ি, নীল টিপে দেখতে চান। আবার নীলকে বলা হয় বেদনার রঙ। ব্রিটিশ বেনিয়ারাও প্রাচীনকাল থেকে নীল রঙ নিয়ে ব্যবসায় মেতেছিলেন। যতদিন কৃত্রিম রঙ আবিস্কার হয়নি, ততদিন প্রভাবশালী ওই বেনিয়ারা বাংলার দরিদ্র চাষিদের দিয়ে জোর করে নীল চাষ করিয়েছে। এ নিয়ে বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহও হয়েছে। ব্রিটিশ-ভারতে ঔপনিবেশিক শাসকরা জোর করে নীল চাষ করানোর জন্য অমানুষিক অত্যাচার-নির্যাতন করেছে।

ব্রিটেন থেকে হাজার হাজার নীলকর এদেশে এসে নীলকুঠি স্থাপন করে। তারা চাষিদের নীল চাষে বাধ্য করে। নির্যাতিত, বঞ্চিত চাষিরা একপর্যায়ে বিদ্রোহ করে, শুরু হয় রক্তক্ষয়ী আন্দোলন, যা ১৮৬০ সালে ভয়াবহ রূপ নেয়। ইতিহাসের পাতায় এটাকেই মহান নীল বিদ্রোহ বলা হয়। এরপর নীল কমিশন গঠন করেও বাংলার চাষিদের দিয়ে আর নীল চাষ করানো যায়নি। এমনকি বাজারে চাহিদা থাকলেও স্বাধীন ভারতে আর দাসত্বের নীল চাষ হয়নি। তবে দেড়শ' বছর পর এসে সেই বাংলাদেশে আবার বাণিজ্যিকভাবে নীল চাষ হচ্ছে। উৎপাদিত নীল রফতানি হচ্ছে আমেরিকা, ইউরোপ, জাপান, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে।

সৃজনশীল উদ্যোক্তারা প্রাকৃতিক রঙের পোশাক-পরিচ্ছদ নিয়ে আসছেন বাজারে। আর শৌখিন গ্রাহক, পরিবেশপ্রেমীরা তার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। বাজারে প্রাকৃতিক রঙের চাহিদা বাড়ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা নীলের। এ চাহিদাকে পুঁজি করে আন্তর্জাতিক সংস্থা কেয়ার বাংলাদেশ 'লিভিং ব্লু' নামের একটি কর্মসূচির মাধ্যমে নীল চাষের উদ্যোগ নিয়েছে। ওই কোম্পানির পৃষ্ঠপোষকতায় রংপুর জেলার রাজেন্দ্রপুর ও পাগলাপীর এলাকায় প্রায় দুই হাজার কৃষক তিন হাজার একর জমিতে নীল চাষ করছেন। এতে কৃষকরা যেমন লাভবান হচ্ছেন, তেমনি দেশ পাচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা।

এ বিষয়ে লিভিং ব্লুর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিশায়েল আজিজ আহমেদ সমকালকে বলেন, সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের অধিকার আদায়ে ২০০৫ সালে লিভিং ব্লু কাজ শুরু করে। প্রথমে সুশাসন নিশ্চিত করাই ছিল উদ্দেশ্য। এ কাজ করতে গিয়ে দেখা গেল দরিদ্র লোকেরা শুধু অধিকার চায় না, উপার্জনের উৎস চায়। তখন কীভাবে উপার্জনের ব্যবস্থা করা যায় তা নিয়ে ভেবেছে লিভিং ব্লু। দেখা গেল রংপুরের মানুষের নীল চাষের স্বাভাবিক দক্ষতা রয়েছে। নীলকে তারা 'মাল গাছ' হিসেবে চেনে। জমিতে যখন ফসল থাকে না অর্থাৎ দুই ফসলের মধ্যবর্তী সময়ে জমির উর্বরতা বাড়ানো ও জ্বালানির কথা চিন্তা করে এই মাল গাছ চাষ করেন অনেকে। লিভিং ব্লুর এক কর্মকর্তা এই মাল গাছ দেখে অবাক হলেন, তিনি দেখলেন এটা সেই নীল গাছ। তারপর পরীক্ষামূলকভাবে ব্যাপকভাবে চাষ করা হলো। এখন বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে। এ বছর এক টনের বেশি উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছে লিভিং ব্লু।

এ বিষয়ে রংপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. সরওয়ারুল হক সমকালকে বলেন, রংপুরের বিভিন্ন এলাকায় সামান্য পরিমাণে নীল চাষ হচ্ছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান স্থানীয় চাষিদের কাছ থেকে নীল পাতা কিনে নিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে থাকে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের গবেষকরাও নীল চাষ বিষয়ে খোঁজ-খবর নিয়েছেন। কীভাবে এ চাষ আরও লাভজনক করা যায় তা নিয়ে নীতিনির্ধারকরা ভাবছেন। তিনি বলেন, নীল চাষ বেশ সহজ। এ জন্য উর্বর জমি লাগে না। আবার সার বা কীটনাশকের প্রয়োজনও হয় না। আগাছা দমনের কাজও তেমন নেই। ফলে চাষিরা সহজে এ চাষ করে লাভবান হতে পারেন।

সংশ্নিষ্টরা জানিয়েছেন, শুরুর দিকে বাজার থেকে বীজ কিনে চাষ করতেন রংপুরের চাষিরা। এখন নিজেরাই বীজ উৎপাদন করছেন। এক কেজি নীল পেতে ২৫০ কেজি পাতা লাগে। প্রতি কেজি পাতার জন্য চাষিরা পান তিন টাকা। একটি গাছ থেকে এক মৌসুমে দু'বার পাতা কাটতে পারেন কৃষকরা। পাতা কাটার পর শুকনো নীল পেতে চার দিন সময় লাগে। তবে ভালো রোদ থাকতে হয়। রংপুরে লিভিং ব্লুর নীল প্রক্রিয়াকরণের ব্যবস্থা রয়েছে। সাধারণত যেসব জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে, সেই জমিতে যখন তামাক থাকে না, তখন চাষিরা নীলের চাষ করছেন। নীল পরিবেশ বা অন্যান্য চাষের জন্য ক্ষতিকর নয়। নীলের পাতা ছাড়া গাছের কাণ্ড জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

লিভিং ব্লু জানিয়েছে, গত বছর আমেরিকার স্টোনি ক্রিক কালারস বাংলাদেশ থেকে এক টন নীল নিয়েছে। ফ্রান্সের লোয়ে কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে নীল কিনছে। এ ছাড়া কানাডা, জাপান ও ভারতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান লিভিং ব্লু থেকে নীল সংগ্রহ করছে। লিভিং ব্লুর নিজস্ব কিছু কার্যক্রম রয়েছে, সে জন্য বছরে ২৫০ কেজি নীল প্রয়োজন হয়। আর দেশের আবুল খায়েরের মালিকানাধীন বেঙ্গল গ্রুপের 'অরণ্য' নামের প্রতিষ্ঠানটি লিভিং ব্লু থেকে বছরে ২৫০ কেজি নীল নেয়। এ ছাড়া দেশে আরও ছোট ছোট প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা অল্প পরিমাণে নীল কিনে থাকে। ভারতে বাংলাদেশের নীলের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। লিভিং ব্লু প্রতি কেজি নীল বর্তমানে ৬০ ডলার দরে রফতানি করে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে উৎপাদিত নীল উৎকৃষ্টমানের। যে কারণে এর সম্ভাবনাও প্রচুর।

বিষয় : নীল চাষ

মন্তব্য করুন