যে বাড়িতে মেহগনি-একাশিয়া-ইউক্যালিপ্টাস ছাড়া কোনো গাছ নেই, তার শিশুরা নিশ্চয়ই ফল বলতে কেবল দোকান থেকে কিনে খাবার জিনিসই বোঝে! কারণ এসব বিদেশি কাঠনির্ভর গাছে মানুষের জন্য খাদ্যতো নেইই, পশু-পাখিরাও খেতে পারে না এসব গাছের ফল। আর গাছতো কেবল টাকা বা কাঠ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আত্মীক ও প্রাকৃতিক সম্পর্কও। তাই উত্তরপ্রজন্মের পুষ্টি, সমৃদ্ধি ও সুষম মানসিক বৃদ্ধির কথা চিন্তা করে দেশে ব্যাপক হারে ফল গাছ রোপণ জরুরি। আর এ উদ্যোগ নিয়েই ‘ফলদ বাংলাদেশে’র কর্মীরা কাজ করে যাচ্ছেন ১০ বছর ধরে।

এরই ধারাবাহিকতায় এবার উত্তরের সাত জেলায় বুধবার থেকে শুরু হয়েছে ‘ফলদ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন’-এর বৃক্ষরোপণ অভিযান। প্রতি বর্ষার মতোই এবারও সংগঠনটি দেশব্যাপী তাদের ফলদ অভিযান শুরু করেছে।  এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।

এতে বলা হয়, ১ জুলাই থেকে এবারের অভিযান শুরু হয়েছে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার রাঙ্গীছড়া এলাকায় ফলদ বৃক্ষরোপণের মধ্য দিয়ে। এর পর ২ জুলাই হবিগঞ্জের পইল গ্রামের বাড়ি বাড়ি ফলের চারা রোপণের পরই সংগঠনের আরেকটি দল রওনা হয় উত্তরবঙ্গের উদ্দেশে।

এই অভিযানের নেতৃত্বে আছেন— সংগঠনের সভাপতি ও প্রধান সমন্বয়ক জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক দ্রাবিড় সৈকত এবং অন্যতম সদস্য রাতুল মুন্সী ও এইচ এইচ রাজন। অভিযান চলাকালে এই সাত জেলা ও আশপাশের জেলায় অবস্থানরত সদস্যরা সুবিধামতো যুক্ত হবেন কর্মসূচিতে। উত্তরবঙ্গের জেলা সিরাজগঞ্জ থেকে শুরু হয় কার্যক্রম। এর পর নাটোর, রাজশাহী, দিনাজপুর, নীলফামারী লালমনিরহাট ও গাইবান্ধার বিভিন্ন বাড়িতে ১৫ জুলাই পর্যন্ত রোপণ করা হবে আম, জাম, লিচু, বেল, কাঁঠাল, সফেদা, তেঁতুল, পেয়ারা, জামরুল, জলপাই ও আমলকি ইত্যাদি ফলের চারা।

গত ১০ বছর ধরে ‘পুষ্টি অর্থ সবুজ পথ, ফলের গাছেই ভবিষ্যৎ’- স্লোগানকে সামনে রেখে সংগঠনটি সারাদেশে ফল গাছ রোপণের পাশাপাশি দেশব্যাপী মেহগনি, ইউক্যালিপ্টাস, একাশিয়া, রেইনট্রি ও শিশু গাছের মতো আগ্রাসী ক্ষতিকর গাছের ক্রমবর্ধমান বনায়নের বিপরীতে ফল গাছ রোপণে দেশবাসীকে উৎসাহিত করার কাজ করে আসছে। ইতোমধ্যে সংগঠনটি সারাদেশে সদস্য তৈরি ও সাংগঠনিক কাঠামো জোরদার করার জন্য প্রাথমিকভাবে ৬৪ জেলা পদার্পণ কর্মসূচি হাতে নেয়। সেই ধারাবাহিকতায় এ মৌসুম শেষে সংগঠনটি দেশের ৬০তম জেলায় পদার্পণ সমাপ্ত করবে। বর্ষা মৌসুম ছাড়াও সংগঠনটি সারাবছর ব্যস্ত থাকে প্রচারণা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২০ সালে সংগঠনটি পরিচালনা করে দেশের প্রথম বৃক্ষপদযাত্রা। ফল গাছের জন্য ৫১২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পদযাত্রা সম্ভবত বিশ্বেই প্রথম।

এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত এই কার্যক্রমটি সংগঠনের স্বাবলম্বী সদস্যদের সহযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে যাচ্ছে। এভাবে ৬৪ জেলায় সাংগঠনিক পদচারণা প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে সংগঠনটি সরকারি-বেসরকারি বনায়ন প্রকল্পগুলোতে বিদেশি আগ্রাসী কাঠসর্বস্ব গাছ রোপণ থেকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছে। 

ফলদ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন সারাদেশে গ্রামে গ্রামে ফল গাছগুলো রোপণ করে মূলত মানুষের বাড়িতে বাড়িতে। যেন গাছগুলো সেই সেই বাড়ির বাসিন্দাদের যত্ন পেয়ে নিশ্চিতভাবে বেড়ে উঠতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় সংগঠনটির সফলতা প্রায় শতভাগের কাছাকাছি। কারণ রোপণ করা এসব গাছের প্রায় ৯৫ ভাগই এখন কোনো না কোনো বাড়ির আঙিনায় ফল দিচ্ছে।

স্বেচ্ছাসেবী এ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ গত বছর সংগঠনটি অর্জন করেছে ‘শেখ হাসিনা ইউথ ভলান্টারি অ্যাওয়ার্ড’। এ পর্যন্ত সারাদেশে প্রায় পৌনে তিন লাখ ফল গাছ রোপণের পর সংগঠনটি স্বপ্ন দেখে— একদিন তাদের তত্ত্বাবধানে দেশে অন্তত ৫ কোটি ফল গাছ রোপণ সম্ভব হবে, যা দেশের পুষ্টি, অর্থনীতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।