সাত, অনেকের কাছে 'লাকি সংখ্যা'। তিনিও হয়তো সেটাই ভেবেছিলেন। তাই সাত গাভি দিয়ে সূচনা। ২০০৮ সালে দুগ্ধ খামারের যে স্বপ্নবীজ পুঁতেছিলেন, ১৪ বছর পর তা এখন মহিরুহ। সাত থেকে এখন গরুর সংখ্যা ২ হাজার ১২৫। শুধু কী গরু; আছে পাঁচ শতাধিক ছাগল-বেড়া, চারটি উট, ৫৫টি মহিষ ও ১০০টি দুম্বা। গল্পটা এক ইমরান হোসেনের। বিবিএ করেছেন ইনডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ২০০২ সালে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে পৈতৃক ঢেউটিনের ব্যবসায় নিজেকে জড়ান। সেই ব্যবসায় মন টেকেনি। ২০০৮ সালে নিজেই হাঁটেন নতুন পথে, একা।

রাজধানীর বছিলায় ১০ কাঠা জমিতে গড়ে ওঠা ইমরান হোসেনের 'সাদেক এগ্রো' এখন দুগ্ধশিল্পের এক তাজা বিজ্ঞাপন। সময়ের হাত ধরে সেই খামারের ব্যাপ্তি বেড়েছে অনেক। ঢাকার গণ্ডি ছাড়িয়ে কুমিল্লা, পাবনা, যশোর, বেনাপোল, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়েছে দুগ্ধ প্রতিষ্ঠানটির সুখ্যাতি। এখন ৪০০টি গাভি থেকে দৈনিক উৎপাদন হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ কেজি দুধ। গত কোরবানি ঈদেই সাদেক এগ্রো পশু বিক্রি করেছে প্রায় ২৯ কোটি টাকার।

তারপরও কিছুটা হতাশার সুর এই তরুণ উদ্যোক্তার কণ্ঠে। তিনি বলেন, একটি গরু থেকে দৈনিক ৫০ কেজি দুধ সংগ্রহ করতে চাই। এ রকম গরুর উপকরণ আমদানি করতে গেলে আসে পদে পদে বাধা। দুধের উৎপাদন বাড়াতে যে জাতের গাভি দরকার তাতে সরকার অনুমতি দিতে চায় না। কৃষি যন্ত্রপাতি শুল্কমুক্ত হলেও ডেইরি খাতের সরঞ্জাম আমদানি করতে গেলে গুনতে হয় ৩৫ শতাংশ শুল্ক। ২০৩০ সালের মধ্যে দুধের ঘাটতি মেটানোর পরিকল্পা নিয়েছে সরকার। আশা করছি, সহায়তা পেলে আগামী তিন বছরে সেই লক্ষ্য পূরণ করা যাবে।

ডেইরি খাতে ইমরান হোসেনের মতো এ রকম বিনিয়োগকারী বাড়ছে বছর বছর। বাংলাদেশ ডেইরি ফারমারস অ্যাসোসিয়েশনের নিবন্ধিত সদস্য ৮৬ হাজার। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে নিবন্ধিত খামার ৬৮ হাজার ৭৭৭টি। অনেকের খামারে উন্নত জাতের গাভি পালন হয় আধুনিক পদ্ধতিতে।

এ রকম প্রেক্ষাপটে নানা আয়োজনে আজ বুধবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব দুগ্ধ দিবস। দুগ্ধ খাতের কার্যক্রম বাড়াতে ২০০১ সাল থেকে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) উদ্যোগে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। দিবসটি উপলক্ষে আজ দুপুরে রাজধানীর ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে দুগ্ধ খামারি ও উদ্যোক্তাদের 'ডেইরি আইকন' পুরস্কার দিচ্ছে প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম।

ছোট খামারিরাও ভালো নেই: বড় খামারির পাশাপাশি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে রয়েছে কয়েক লাখ ছোট খামারি। এ রকমই একজন মোমেনা আক্তার। রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে বুড়িগঙ্গা নদী পেরিয়ে আঁকাবাঁকা মেঠোপথ ধরে গ্রাম কাঁঠালতলী। সেখানে বাড়ির আঙিনায় মাথায় ঘোমটা টেনে দুধ দুইছেন বয়স পঞ্চাশের ঘরে থাকা মোমেনা। দুধের বালতি ভরতেই তিনি হন্তদন্ত হয়ে রাস্তায় দাঁড়ানো পিকআপের দিকে ছুটলেন। ৫০ টাকা করে চার কেজি দুধ ২০০ টাকায় তুলে দিলেন এক পাইকার ব্যবসায়ীর হাতে। মোমেনা প্রতিদিন গড়ে ৪-৫ কেজি দুধ পান। এখন গো-খাদ্যের দাম বাড়ার কারণে লাভ তো দূরের কথা, দুধ বিক্রি করে গাভিকে খাওয়ানোর খরচই তুলতে পারছেন না তিনি।

খামারিরা বলেন, সময়ের বিবর্তনে ঘাস দিয়ে এখন আর হয় না। বাইরে থেকে খাবার সরবরাহ করতে হয়। যেভাবে গো-খাদ্যের দাম বাড়ছে, তাতে গরু পালন করা কঠিন। এ অবস্থায় দুধের দাম বাড়ানো এবং সরকারি উদ্যোগে খামারিদের রেশনিং পদ্ধতিতে পশুখাদ্য সরবরাহের ব্যবস্থা করা না গেলে কোরবানি ঈদের পর অনেকেই গরুর খামার বন্ধ করতে বাধ্য হবেন।

তবু বাড়ছে দুধ উৎপাদন: সংকট ও বাধা-বিপত্তির মাঝেও দেশে বছর বছর বাড়ছে দুধ উৎপাদন। বাড়ছে মাথাপিছু প্রতিদিন দুধ পানের পরিমাণও। তারপরও দেশের মানুষ এখনও প্রয়োজনের চেয়ে কম দুধ পান করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুধ পানের পরিমাণ বাড়াতে উৎপাদনে নজর দিতে হবে। এর জন্য খামারিদের উন্নয়ন দরকার। গো-খাদ্য সহজলভ্য করতে হবে। খামার থেকে ভোক্তা পর্যায়ে মধ্যস্বত্বভোগীর তৎপরতা বন্ধ করতে হবে। মনোযোগ দিতে হবে দুধ সংরক্ষণের ব্যবস্থা উন্নত করা ও প্রক্রিয়াজাতকরণে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বলছে, ১১ বছরে দেশে দুধের উৎপাদন বেড়েছে ৮৪ শতাংশ। দুধের উৎপাদন বেশ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে থাকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে। ওই অর্থবছরে আগের বছরের চেয়ে দুধের উৎপাদন প্রায় ২৭ শতাংশ বেড়ে যায়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১৪ সালে ভারতে নরেন্দ্র মোদি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ওই দেশ থেকে গরু আসা অনেকটাই বন্ধ হয়ে যায়। এতে দেশে গরু পালনে উৎসাহ তৈরি হয়। পাশাপাশি গরু পালন লাভজনকও হয়। ২০১১-১২ অর্থবছরে দুধ উৎপাদন হয় ৩৪ লাখ ৬০ হাজার টন। ২০১৬-১৭ অর্থবছর বেড়ে দাঁড়ায় ৯৪ লাখ টনে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে প্রায় ১ কোটি ৬ লাখ টন দুধ উৎপাদিত হয়। সর্বশেষ ২০২০-২১ অর্থবছরে দুধের উৎপাদন দাঁড়ায় এক কোটি ১৯ লাখ টনে। দুধের চাহিদা ১ কোটি ৫৪ লাখ টন। সে দিক থেকে এখনও ঘাটতি আছে ৩৫ লাখ টন। উৎপাদন যেমন কম, তেমনি দুধ পানেও পিছিয়ে বাংলাদেশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, একজন মানুষের দৈনিক ২৫০ মিলিলিটার করে দুধ পান করা দরকার। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২০-২১ অর্থবছরে মাথাপিছু দুধের প্রাপ্যতা দিনে ১৯৩.৩৮ মিলিলিটার, যা ২০১৯-২০ অর্থবছরে ছিল ১৭৫ মিলিলিটার এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ছিল ১৬৫ মিলিলিটার। তবে বাংলাদেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অ্যানিমেল নিউট্রিশন বিভাগের একাধিক শিক্ষকের জোট ইন্টিগ্রেটেড ডেইরি রিসার্চ নেটওয়ার্কের (আইডিআরএন) গত বছরের এক গবেষণা বলছে, দেশে মাথাপিছু দুধপান ৫০ থেকে ৬০ মিলিলিটারের বেশি নয়।

আইডিআরএন ও আইএফসিএন-ডেইরি রিসার্চ নেটওয়ার্কের তথ্য বলছে, বৈশ্বিকভাবে খামারপ্রতি দুধের উৎপাদন সাত টন। বাংলাদেশে এ হার দুই টন। খামারিরা বলছেন, দেশে দুধের জন্য ভালো জাতের গরুর সংকট রয়েছে। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও নিউজিল্যান্ডের মতো দেশে একটি গরু দিনে ১৫ থেকে ২০ লিটার দুধ দেয়। বিপরীতে দেশি গরু দেয় গড়ে ২ লিটার দুধ।

বাংলাদেশ ডেইরি ফারমারস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাহ মো. এমরান বলেন, উৎপাদন বাড়াতে হলে দেশে আরও উন্নত জাতের গাভি নিয়ে আসতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে দুগ্ধশিল্পের উন্নয়নে ৪,২৮০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। 'প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন' নামে ওই প্রকল্পের প্রধান কারিগরি সমন্বয়ক ডা. মো. গোলাম রব্বানী বলেন, প্রকল্পের আওতায় ১ লাখ ৯১ হাজার খামারির ওপর জরিপ শেষ হয়েছে। ডাটাবেজ তৈরি হচ্ছে। ৫,২৯৪টি প্রোডিউসার গ্রুপ গঠন হয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে খামারিরা যেমন তাঁদের পণ্যের বাড়তি দাম পাবেন, তেমনি ভোক্তা পর্যায়ে ভালো মানের দুধ পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।