বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল রাজনৈতিক অভিঘাতে গড়ে ওঠা এমন এক ভূমিকার জন্মদাতা, যা ভাষাকে নিয়ে গেছে সৃষ্টিশীলতা ও সংস্কৃতির বিপুল পরিসরে। তেজবন্ত সেই পরিসরে 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই'- এই বাণীর যতটা না তাৎপর্য, আরও বেশি ফলপ্রসূ হয়ে উঠেছে, ভরে উঠছে সৃজনশীলতা ও সংস্কৃতির পসরা হয়ে। কারণ সংস্কৃতি হচ্ছে মানবমনের বিরাট অঞ্চলজুড়ে ছড়ানো এবং সংস্কৃতি একমাত্রিক নয়, বহুমাত্রিক ও বিভিন্ন। তাই সংস্কৃতি বলতে বুঝে নেব গোষ্ঠী-কৌম-অঞ্চল-শ্রেণি-জাতি-দেশ ও বিশ্ববলয়ের মধ্যে ক্রিয়াশীল মানব জীবনযাত্রার নানা কৃত্য ও তার উপাদানসমূহকে, তার বিকিরণ ও উপযোগকে এবং ব্যক্তিক মুখশ্রীকেও। কেননা, ব্যক্তির মধ্য দিয়েই তার গোষ্ঠী ও দেশের সংস্কৃতি চর্চিত হয়। ব্যক্তি সংস্কৃতিমান হলেই সমাজ-সংস্কৃতি ও ভাষা দৃশ্যবাস্তবতা লাভ করে। আর ভাষা যেহেতু Functional, তাই সংস্কৃতি-পরিচর্যা সেই ক্ষেত্রে হয়ে ওঠে যেখানে ব্যক্তির বিচিত্র জীবনচারণা চরিতার্থ হতে পারে। তার বিচ্ছিন্ন একাকী অস্তিত্বকে সকলের সঙ্গে অভিন্নসূত্রে বাঁধতে পারে। স্মরণ রাখা আবশ্যক, ভাষিক ও সংস্কৃতিমান মানুষই আবার অন্যের সঙ্গে বা ভিন্ন ভাষার সঙ্গে ভিন্ন অঞ্চলের সংস্কৃতির সঙ্গে নিজের বিভেদকে বুঝতে পারে। এই বিভেদবোধই ব্যক্তির স্বকীয়তা ও নৈতিকতা। অর্থাৎ ভাষাই সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর মানুষগুলোকে এক সূত্রে যেমন বাঁধে, তেমনি একজন ব্যক্তিকে স্বতন্ত্রও করে। আমাদের একুশের ভাষা আন্দোলন এই সাংস্কৃতিক তাৎপর্যের লক্ষ্যে যেমন নিবেদিত, তেমনি সংশ্নিষ্ট হয়ে আছে আমাদের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে অংশগ্রহণের নিশ্চয়তাপ্রাপ্তির অঙ্গীকারের সঙ্গেও। কৃষিজীবী বাংলাদেশের জন্য তাই অপেক্ষমাণ ছিল লোকসংস্কৃতি ও লোকভাষাকে স্বীকৃতি প্রদানের রাজনীতিও। তাই জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে ভাষা যতটা না চর্চিত হয়েছে, তারও বেশি হয়েছে বাঙালি জাতির সৃষ্টিশীল ও সাংস্কৃতিক কাঠামো বিনির্মাণের কাজটি।


হয়তো এখনও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা আইন-আদালত ও উচ্চশিক্ষায় বাংলা ভাষার কার্যকর প্রয়োগ ঘটছে না তেমনভাবে, তবু সাহিত্যজগতে নানা সামাজিক কৃত্য ও অনুষ্ঠানে, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বাংলা সুপ্রতিষ্ঠিত ও ক্রমবিকশিত। মান ভাষার হেজিমনি ভেদ করে নগরেও লোকভাষার একটা স্বকীয় রূপ দিনে দিনে গঠিত হচ্ছে। তাতে বাংলাদেশীয় বাংলা ভাষার নিজস্বতাই প্রতিপাদিত। আমরা একে বলতে পারি নগরলৌকিক ভাষা সংস্কৃতি, যাতে মিশছে আঞ্চলিক ভাষার শব্দবাক্য ইত্যাদিও। এতে ভাষা প্রাণবন্ত হচ্ছে, বৈচিত্র্য বাড়ছে এবং সংস্কৃতির মুখশ্রী লাবণ্যমণ্ডিত হচ্ছে। অর্থাৎ ভাষাবৈচিত্র্যই সংস্কৃতিকে বিকশিত করছে। পহেলা বৈশাখ এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। লোকসংস্কৃতির নানা আয়োজনে খোদ ঢাকাতেই দেখা যাচ্ছে পণ্য সংস্কৃতি, রয়েছে লোকগান ও বিভিন্ন কৃত্য। হিন্দি ভাষার প্রভাব বা ইংরেজি ভাষার আগ্রাসন এবং টেকনোলজির ভাষা ইত্যাদি আমাদের সংস্কৃতির ভাষাকে গ্রস্ত করছে বটে, তবে প্রাণশক্তিও জোগাচ্ছে। আমরা একটি মিশ্র সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। তার সঙ্গে অভিঘাত ঘটাচ্ছে সেক্যুলার ও ধর্মীয় সংস্কৃতির দ্বন্দ্ব। একমাত্র বাংলা ভাষার সর্বমাত্রিক বিস্তার ও সৃষ্টিশীল বিকাশ সাধনের মধ্য দিয়েই ওই দ্বন্দ্ব-নেতিবাচক প্রভাব-প্রতিক্রিয়া ও আগ্রাসন থেকে আমরা মুক্ত থাকতে পারি।

বাংলা ভাষার জ্ঞানতত্ত্ব যেমন আরও প্রসারিত করা বাঞ্ছনীয়, তেমনি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এই ভাষাকে কার্যকররূপে প্রতিষ্ঠা দেওয়াটাই একমাত্র করণীয়। প্রতি একুশে ফেব্রুয়ারিতে আবেগঘন শহীদ মিনারে পুষ্পাঞ্জলি প্রদানের যে সংস্কৃতি, তা সেই কার্যকর প্রক্রিয়াকে বাস্তবায়নে আরও সক্রিয়তা দিক- তাই হোক আজকের দীপ্ত শপথ। ভাষার সংস্কৃতি যত বেগবান হবে, ততই বাংলা ভাষা প্রসারণশীল হবে। আর সে ক্ষেত্রে মূল দায়বদ্ধতায় অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবেন সৃষ্টিশীল প্রতিভান্বিত সংস্কৃতিমান ব্যক্তিবর্গ। তারা হতে পারেন নগরের মান ভাষাধারী অথবা গ্রামীণ সংস্কৃতির কৃষিজীবী। সমাজের সর্বস্তরে তাদের সৃষ্টিকর্ম বাঙালির অস্তিত্ব ও ঐতিহ্যকে এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণকে বেগবান করবে। সংস্কৃতির ভাষাই একটি শিশুকে ইতিহাসিত করে। যেমন, মা যখন শিশুকে ঘুম পাড়ায়- 'খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো/বর্গী এলো দেশে/বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেবো কিসে?' তখন শিশুটি ইতিহাসের সেই বাস্তবতায় প্রবেশ করে, যেখানে ছিল বর্গিদের অত্যাচর, রাজাকে খাজনা দেওয়া আর সেই রাজা হচ্ছে ইংরেজ রাজশক্তি। সংস্কৃতির ভাষা তাই শিশুর জানার জগৎ বিনির্মাণ করে।
বাংলাদেশের জনপদ ও জনপুঞ্জের ঐক্যবদ্ধতা ও সংহতিই বাংলা ভাষার সংস্কৃতিকে প্রাণবন্ত ও সজীব রেখেছে। তবে, অবশ্যই মান ভাষার চর্চা ও চলমান গঠন প্রক্রিয়া, প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন ঘটানোর কাজটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই অব্যাহত রাখতে হবে। প্রয়োজনবোধে তাতে অনুপ্রবেশ ঘটবে সংস্কৃতির ভাষার শব্দাবলিও, তবে প্রাসঙ্গিকভাবে।
লেখক
প্রাবন্ধিক
শিক্ষাবিদ