১০ বছরে নালিশ শোনেনি কেউ

নোয়াখালীর বেদেপল্লীতে হামলা

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮     আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮       প্রিন্ট সংস্করণ     

আনোয়ারুল হায়দার, নোয়াখালী

'এওজবালিয়ার এক যুবক। যিনি স্থানীয় একটি গণমাধ্যমে কাজ করেন। ঘটনার দিন সোমবার দুপুর ১২টায় তিনি ফোন করে জানালেন, বেদেরা এক কিশোরকে গরম তেলে চুবিয়ে হত্যা করেছে। এর কিছুক্ষণ পর তিনি জানালেন, গ্রামবাসী বেদেপল্লীতে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারপর হামলা হলো, বসতঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু ছোটখাটো ঘটনা বলে ওই সাংবাদিক সবার কাছে প্রচার করেন। সালিশের মাধ্যমে ঘটনা সুরাহা হয়ে গেছে বলেও তিনি সাংবাদিকদের জানান। হামলার সময় টহল পুলিশ থাকলেও তাদের চোখের সামনেই হামলা হয়েছে। নানা বিভ্রান্তি আর গুজবের ডালপালা ছড়াতে ছড়াতে যখন সন্ধ্যা নামে ততক্ষণে শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরের বেদেপল্লীতে যেতে পারেননি সাংবাদিকরা। স্থানীয় ওই সাংবাদিকের সরবরাহ করা একটি সংবাদই অধিকাংশ সাংবাদিক অফিসে পাঠান।' নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি শীর্ষ গণমাধ্যমের জেলা প্রতিনিধির দায়িত্বে থাকা এক সাংবাদিক দুঃখ করেই কথাগুলো বলছিলেন। তিনি বলেন, সকাল থেকেই বেদেপল্লীতে উত্তেজনা ছিল; কিন্তু সবাই ঘটনাটি আড়াল করার চেষ্টা করেছেন। প্রশাসনও গুরুত্ব দিল না। 

এমন হামলা, হুমকি ও অবহেলা ১০ বছর ধরে চলেছে নোয়াখালী সদর উপজেলার পূর্ব এওজবালিয়া গ্রামের বেদেপল্লীতে। ২০০৮ সালে নিজেদের কেনা জমিতে উচ্ছেদ আতঙ্কে থাকা বেদেরা বারবার জেলার কর্তাব্যক্তিদের কাছে ধরনা দিয়েও নিরাপত্তা পাননি। বসবাস শুরুর পর থেকে পাঁচবার হামলার মুখে পড়লেও বিচার হয়নি। ২০১৬ সালের মার্চে হামলার পর বিচার চেয়ে বেদেরা মানববন্ধন ও জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেন। এরপর তৎকালীন জেলা প্রশাসক বদরে মুনীর ফেরদৌস (বর্তমানে প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংকের ডিএমডি) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (বর্তমানে হবিগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক-রাজস্ব) নূরুল ইসলামকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু দুই বছরেও সেই প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি। 

নোয়াখালী জেলা প্রশাসক তন্ময় দাস সমকালকে বলেন, 'তদন্ত রিপোর্টটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাওয়া যায়নি। তবে রিপোর্টটির জন্য পুলিশের কাছে রিকুইজিশন দেওয়া হয়েছে। রিপোর্টে কী লেখা হয়েছে তা খতিয়ে দেখে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।' 

তৎকালীন জেলা প্রশাসক বদরে মুনীর ফেরদৌস সমকালকে বলেন, ওই ঘটনা সম্পর্কে তদন্ত কর্মকর্তা কী রিপোর্ট দিয়েছিলেন তা এখন তার মনে নাই। এ ব্যাপারে তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।

তদন্ত কর্মকর্তা নূরুল ইসলাম বলেন, 'হামলার ঘটনায় তদন্ত করে রিপোর্ট ডিসি বরাবর পেশ করেছি এবং বেদেদের সঙ্গে এলাকাবাসী ও হামলাকারীদের সমঝোতা করে দিয়েছিলাম।'

বেদেদের অভিযোগের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত ২০১৬ সালের মানববন্ধনের সংবাদে দেখা গেছে, ইউনিয়ন যুবলীগেরসভাপতি হেলাল, জসিম উদ্দিন, ইউপি সদস্য নূর আলম ওরফে আমিন, সোলেমান, জোবায়েদ আলী, দুলালসহ কয়েকজন প্রভাবশালী নানা অজুহাতে তাদের ওপর হামলা চালান। গত সোমবারের ঘটনায়ও যুবলীগ নেতা হেলাল ও স্থানীয় ইউপি সদস্য আমিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন বেদেরা। 

বেদে সর্দার ওয়াসিম ও কামাল সমকালকে বলেন, বারবার নানা ইস্যু তৈরি করে হামলা-ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ করে আমাদের উচ্ছেদের চেষ্টা হচ্ছে। গত সোমবারের তাণ্ডবের সঙ্গে বিগত সময়ের হামলা-ভাংচুরের যোগসূত্র রয়েছে। প্রতিটি ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে সোমবারের হামলার ইন্ধনদাতারা। স্থানীয় যুবলীগ নেতা হেলাল ও ৬ নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার আমিনসহ আরও কয়েকজন হামলায় জড়িত। তাদের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে বেদেপল্লীর জমি দখল। তারা আরও বলেন, হামলাকারীরা দীর্ঘদিন ধরে আমাদের কাছে দলিলপ্রতি ২০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিল। চাঁদা না দিলে গুম, হত্যা ও এলাকা ছাড়ার হুমকি দেওয়া হয়।

অবশ্য বেদেসর্দারের অভিযোগ অস্বীকার করে ইউপি সদস্য আমিন বলেন, গরম তেলে ঝলসে যাওয়া কিশোর তারেক আজিজকে সোমবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যাওয়ার গুজব ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় উত্তেজনা দেখা দেয়। এ সময় দগ্ধ কিশোরের স্বজন বিএনপি নেতা মোতালেব মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে স্থানীয় সন্ত্রাসী সালাহ উদ্দিন, জয়নাল, বাবুল ও সাইদুল হকের নেতৃত্বে শত শত লোক নিয়ে বেদেপল্লীতে হামলা চালান। তিনি ও যুবলীগ নেতা হেলালসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও মেম্বারদের নিয়ে পুলিশের সঙ্গে হামলাকারীদের প্রতিহত করতে কাজ করেছেন। যুবলীগ নেতা হেলাল বলেন, রাজনৈতিকভাবে হেয় করার জন্য প্রতিপক্ষের ইন্ধনে বেদেদের একটি পক্ষ তার নামে এ অপপ্রচার চালাচ্ছে। তিনি জমি দখলের পক্ষে নন বলে দাবি করেন।

বেদেদের নির্যাতনে স্থানীয় এক কিশোরের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে গত সোমবার পুরো বেদেপল্লীতে তাণ্ডব চালানো হয়। হামলায় বেদেপল্লীর অন্তত ৩০টি ঘরে আগুন দেওয়া হয়েছে। ভাংচুর ও কুপিয়ে তছনছ করা হয়েছে আরও অন্তত ৫০টি ঘর। লুটপাট করে নিয়ে গেছে স্বর্ণালঙ্কার, চাল ও আসবাব। এতে নিঃস্ব হয়ে গেছে ৮০ থেকে ১০০টি পরিবার। শারীরিকভাবে নির্যাতিত হয়েছেন ২০ বেদে। এর মধ্যে ১০ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পুড়ে গেছে ১১০টি সাপ। 

হামলার পর শতাধিক বেদে নারী-পুরুষ ও শিশু নিজ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। এখনও শত শত বেদে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন। শুধু স্থানীয় সাংসদ একরামুল করিম চৌধুরী নগদ কিছু টাকা, ৫০টি লুঙ্গি ও ১০০টি শাড়ি দিয়েছেন। এর বাইরে এখনও তাদের পুনর্বাসনের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো হামলার শিকার বেদেরা মামলার ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। স্থানীয় প্রভাবশালীরা তাদের মামলার ভয় দেখাচ্ছেন বলেও অভিযোগ বেদেসর্দার কামালের। 

গত সোমবারের হামলার ঘটনায় সুধারাম থানায় দুটি পৃথক মামলা হয়েছে। দগ্ধ যুবক তারেক আজিজের বাবা বাদী হয়ে ১২ জনের নাম উল্লেখসহ আরও কয়েকজনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করে সোমবার সন্ধ্যায় সুধারাম মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। অন্যদিকে বেদেসর্দার জাকির হোসেন ২৮ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকশ' ব্যক্তিকে আসামি করে একই থানায় মামলা করেন। এ ঘটনায় পুলিশ পাঁচজনকে আটক করে। বেদেসর্দারের দায়ের করা মামলা নিয়ে গতকাল বুধবার বেদেপল্লীতে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। একাধিক বেদে জানান, হামলার সঙ্গে যারা জড়িত বা যাদের ইন্ধনে হামলা হয়েছে তাদের আসামি করা হয়নি। পুলিশের উপস্থিতিতে হামলা হলেও মামলায় তা উল্লেখ করা হয়নি। যারা ঘটনা ঘটিয়েছে তারা নিজেরাই থানায় উপস্থিত থেকে লোকদেখানো মামলা দায়ের করেছে। এতে দেখা গেছে, অনেক নিরীহ লোককেও আসামি করা হয়েছে। 

এ বিষয়ে সুধারাম মডেল থানার ওসি আনোয়ার হোসেন বলেন, বেদেসর্দার যাদের নাম উল্লেখ করেছেন শুধু তাদেরই আসামি করা হয়েছে। 

মারুফ হাসান মিঠু, মো. নূরুজ্জামান, তাহেরা খাতুন, মো. রাজু, মালা বিবিসহ হামলার শিকার বেদেরা বলেন, 'হামলার সময় পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত এসআই নেপাল দাঁড়িয়ে ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি ঘটনার সময় নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছেন। পুলিশের সামনে এ নারকীয় তাণ্ডব চলে। পুলিশ অ্যাকশনে গেলে এমন ঘটনা ঘটত না।' অভিযোগ অস্বীকার করে এসআই নেপাল সমকালকে বলেন, তিনি হামলাকারীদের প্রতিহত করতে প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন। বেদেরা তার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করছে। 

জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) সৈকত শাহীন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, হামলা হওয়ার কোনো কারণই ছিল না। তারপরও উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঘটনার আগে থেকেই পুলিশের একটি টহল টিম সেখানে পাঠানো হয়েছিল। পরে অতিরিক্ত পুলিশ পাঠানো হয়। তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি করলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। 

তিন দিনেও মেলেনি তিন কিশোরীর সন্ধান :হামলার সময় বেদে সম্প্রদায়ের তিন কিশোরী নিখোঁজের তিন দিনেও তাদের সন্ধান মেলেনি। তারা হলো- চতুইল্লার মেয়ে নাসরিন, নূরু মিয়ার মেয়ে সুরু বালা ও মেদুর মেয়ে অঞ্জু। 

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সৈকত শাহীন বলেন, তিন কিশোরী নিখোঁজের বিষয়টি পুলিশের জানা নেই। বেদে সম্প্রদায়ের লোকজন এ ব্যাপারে পুলিশকে কিছু জানায়নি। 

আরও পড়ুন

ভারতের শ্বাস রুদ্ধ করে ’টাই’ আফগানদের

ভারতের শ্বাস রুদ্ধ করে ’টাই’ আফগানদের

ভারত 'বধ' করেই ফেলেছিল আফগানিস্তান। কিন্তু ম্যাচটা শেষ পর্যন্ত টাই ...

১৪ দল-বিএনপি মুখোমুখি

১৪ দল-বিএনপি মুখোমুখি

রাজনীতিতে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও কর্মসূচিকে ঘিরে উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে। এবার ...

পল্টন-সোহরাওয়ার্দী কোনোটাই পাচ্ছে না বিএনপি

পল্টন-সোহরাওয়ার্দী কোনোটাই পাচ্ছে না বিএনপি

আগামীকাল বৃহস্পতিবার প্রথমে রাজধানীতে জনসভা করার ঘোষণা দিয়েছিল বিএনপি। ওইদিন ...

শীর্ষ চার রুশ ব্লগার বাংলাদেশে

শীর্ষ চার রুশ ব্লগার বাংলাদেশে

বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনাকে রাশিয়ার জনগণের সামনে তুলে ধরা এবং দ্বিপক্ষীয় ...

ভূমিহীনের জন্য বরাদ্দ জমিতে বড়লোকের পুকুর

ভূমিহীনের জন্য বরাদ্দ জমিতে বড়লোকের পুকুর

মুক্ত জলাশয়ে মাছ ধরে তা বিক্রি করে সংসার চলতো ভূমিহীন ...

জাতীয় ঐক্যকে চাপে রাখবে আ'লীগ ও ১৪ দলীয় জোট

জাতীয় ঐক্যকে চাপে রাখবে আ'লীগ ও ১৪ দলীয় জোট

শুরুতে স্বাগত জানালেও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া গঠন এবং সরকারবিরোধীদের নিয়ে ...

জিততেই হবে আজ

জিততেই হবে আজ

অতীতের ভুল তারা কখনোই স্বীকার করে না। মানতে চায় না ...

প্রশাসনে নির্বাচনী রদবদল

প্রশাসনে নির্বাচনী রদবদল

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রশাসন সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে ...