শাড়ির জারিজুরি

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

শাহ্‌নাজ মুন্নী

সেলাইবিহীন, বারো হাত লম্বা একটা কাপড় কেমন করে শরীরে জড়িয়ে পেঁচিয়ে ধরে রাখা যায়, এ এক প্রশ্ন বটে অনেকের কাছে, যারা শাড়ি কখনও পরেননি বা পরার কৌশল রপ্ত করতে পারেননি, তাদের কাছে এ তো মহা বিস্ময়ই বটে। সত্যি শাড়ি এক অতি মনোরম আশ্চর্য পোশাক। যে পোশাকের ভাঁজে ভাঁজে আছে অসামান্য সৃজনী প্রতিভা। কতরকম ভাবেই না এই শাড়ি পরা যায়, আটপৌরে, এক প্যাঁচ দিয়ে পরা শাড়ি, কুঁচি দিয়ে পরা শাড়ি, আঁচল ভাঁজ করে পরা বা আঁচল ছেড়ে দিয়ে পরা। কত না নাম এই শাড়ির- ঢাকাই, জামদানি, সিল্ক্ক, সুতি, ধনেখালি, মটকা, জর্জেট, কাতান, মসলিন, বেনারসি ... বলে শেষ করা যাবে না। কবি সাহিত্যিক শিল্পীরা এরকমও বলে থাকেন, নারীর সৌন্দর্য আর ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তুলতে শাড়ির নাকি জুড়ি নেই। কথাটা অবশ্য এ যুগের অনেকেই মানবেন না, কিন্তু শাড়ি যে এক শৈল্পিক সুন্দর সুললিত পোশাক তা বাঙালিমাত্র স্বীকার করবেন।

ছোটবেলায় বাসায় নতুন সুতি শাড়ি আনলে আম্মা আমাকে বলতেন পরে ভাঁজ ভেঙে দিতে। বাচ্চা বয়সে শাড়ি পরে সে কী আনন্দ। আয়নায় বারবার ঘুরেফিরে নিজেকে দেখা। আর কল্পনা করা, যখন বড় হবো তখন কেমন পরিপাটি করে শাড়ি পরব। কী রঙের শাড়ি পরব? ষাট ও সত্তরের দশকে আমার মা-খালারা বয়ঃসন্ধিতেই শাড়ি পরা ধরেছেন। পুরনো অ্যালবামে সাদা-কালো ছবিতে তাদের শাড়ি পরা কাঁচুমাচু চেহারা দেখি। সেই সময় তারা কিন্তু শাড়ি পরেই কলেজে গেছেন। শাড়ি পরেই ঘর-সংসার করেছেন। তখন অলিখিত নিয়মই ছিল তাই। কিন্তু আশির দশকে এসে এ নিয়ম বদলে গেল, হয়তো সময়ের প্রয়োজনেই। কারণ তখনই মেয়েরা ঘরের চার দেয়াল ছেড়ে বাইরে বেরুতে শুরু করল। আমরা তো কলেজ করলাম সালোয়ার-কামিজ-ফ্রকের ইউনিফর্ম পরেই। ইউনিভার্সিটিতেও শাড়ির বদলে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠল সালোয়ার-কামিজ। আগে বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে নারীরা সাধারণত শাড়িই পরত, কিন্তু আশির দশকে সেই প্রচলনও উঠে গেল। বিবাহিত নারীরাও দিব্যি সালোয়ার-কামিজ পরে ঘুরতে লাগল।

আমার আশি বছর বয়সী দাদি খুব বিরক্ত হতেন বাড়ির বউদের এই সালোয়ার-কামিজ পরা দেখে। তিনি বলতেন, 'বাড়ির বউরা কেমন পায়জামা পরে দুই ঠ্যাঙ দেখিয়ে হাঁটে ... শাড়িতে যে সোন্দর লাগে তা কি এই পায়জামা-কামিজে লাগে?'

সৈয়দ শামসুল হক মনে আছে, খুব দুঃখ করে একদিন বলেছিলেন, 'তোমরা এখনকার মেয়েরা শাড়ি পরো না কেন? শাড়ির মতো সুন্দর আর ঐতিহ্যবাহী অন্য কোনো পোশাক কি আর আছে?'

কবি আসাদ চৌধুরীরও একই প্রশ্ন, 'তোমরা কি কখনোই শাড়ি পরো না?'

এসবের উত্তরে বলেছিলাম, এই জমানার বাস্তবতার কথা। এখনকার ব্যস্ত জীবনে কর্মজীবী নারীদের কাছে সালোয়ার-কামিজই আরামের পোশাক। এতে স্বাচ্ছন্দ্যে যেমন চলা ফেরা করা যায়, তেমনি দৌড়ঝাঁপেও কোনো সমস্যা হয় না। তাছাড়া শাড়ি পরতে সময় বেশি লাগে, ম্যাচিং করে ব্লাউজ, পেটিকোট বানাতে হয়, সঙ্গে একটু সাজগোজও লাগে, সব মিলিয়ে শাড়ি পরা আসলে অনেক ঝক্কি।

'না না, যত যাই বলো, বাঙালি মেয়েদের শাড়িতেই বেশি মানায়'- দু'জনেই তখন মাথা নেড়ে বলেছিলেন।

রক্ষণশীলরা বলেন, শাড়িতে নারী দেহ নাকি প্রস্টম্ফুটিত হয় বেশি। তাছাড়া শাড়ি পরার ধরন এমন, যা নারীকে পুরুষের চোখে আবেদনময়ী আর আকর্ষণীয় করে তোলে। ফলে শালীনতার ধ্বজাধারীদের অনেকেই শাড়ির বিরুদ্ধে চোখ রাঙান।

কিন্তু আমি শাড়ি পছন্দ করি, পরতে ভালোবাসি। যদিও প্রতিদিন পরা হয় না। মাঝে সাঝে, কালে ভদ্রে বিশেষ কোনো দিনে। আলমারি খুলে দেখি, শাড়ি জমেছে অনেক। ঈদ, পার্বণে উপহার পাওয়া শাড়ি। এর মধ্যে তিনটা এখনও ভাঁজ খুলে পরাই হয়নি। কিছু আছে হয়তো একবার মাত্র পরেছি। আসলে কোথায় পরব? কখন পরব? সেটা একটা বড় প্রশ্ন। অফিসে কাজের যে ধরন তাতে শাড়ি পরার সুযোগ নেই। কোনো দিন যদিওবা শখ করে পরি সহকর্মীরা চোখে প্রশ্নবোধক চিহ্ন নিয়ে তাকায়। 'কোনো অনুষ্ঠান আছে নাকি আপা?' জানতে চায়। এখনকার মেয়েরা তো আমাদের চেয়েও আরেক কাঠি এগিয়ে, শাড়ি তো দূরের কথা, সালোয়ার-কামিজও নয়, ওদের পছন্দ জিন্স-ফতুয়া বা শার্ট-প্যান্ট। কারণ তাতে চলাচলে স্বাচ্ছন্দ্য আরও বেশি। তবে ইদানীং দেখি আমার কলেজ-ভার্সিটিপড়ূয়া মেয়েরা শখ করে শাড়ি পরতে চায়। বিশেষ বিশেষ দিনে আলমারি থেকে শাড়ি পছন্দ করে নিয়ে আমাকে বলে, 'চিন্তা করো না নেট দেখে ঠিক শাড়ি পরা শিখে নেব।'

'এই জিনিস নেটেও আছে নাকি? বাহ্‌' আমি চমৎকৃত হই। কত অজানারে!

কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই দেখি নাস্তানাবুদ হয়ে শাড়ি নিয়ে আমার কাছে ফিরে এসেছে। বলে, 'নাহ্‌ অনেক হ্যাপা, তুমিই বরং পরিয়ে দাও।'

ভালোই লাগে ওদের এই শাড়ি প্রিয়তা। ভালো লাগে নতুন নতুন শাড়ি পরে আনাড়ি ভঙ্গিতে ওদের হেঁটে যাওয়া দেখতে। একদিন এমন সময় আমাদেরও ছিল। মা-খালারাই শাড়ি পরিয়ে দিতেন। সাবধানে কুঁচি ধরে বড় হয়ে গিয়েছি এমন একটা ভাব নিয়ে হাঁটতাম।

প্রথম দিকে সত্যি শাড়ি সামলাতে হিমশিম খেতাম। মনে হতো, এই বুঝি কুঁচি খুলে যাবে। আঁচল হয় খুব ছোট মনে হতো, নয়তো টানতে টানতে লম্বা হয়ে যেত। কিন্তু পরে ধীরে ধীরে শাড়ি পরা আয়ত্তে এসে গেছে। এখন জানি কোথায় সেফটিপিন লাগালে শাড়ি আর নড়বে না, কুঁচিটা খুলবে না, আঁচলটা ঠিক থাকবে। এখন তো সেফটিপিন ছাড়াও শাড়ি পরে দিব্যি ঘুরে বেড়াতে পারি। ভালোভাবে সামলাতেও পারি।

বিয়ের শাড়ি তো প্রত্যেক মেয়ের কাছেই একটা বিশেষ ব্যাপার। যদিও ইদানীং লেহেঙ্গা-টেহেঙ্গা এসে গেছে। তবু বিয়ের শাড়ির একটা অন্য রকম মাহাত্ম্য থাকে। আমার মায়ের বিয়ের শাড়িটি ছিল বেশ আনকমন, টিয়া রঙের সবুজ জমিনের ওপর জড়ির কাজ। আমার বাবা তার নিজের পছন্দে শাড়িটি কিনেছিলেন। আম্মাকে কখনও সেটা পরতে দেখিনি। যত্ন করে আম্মা ওটা রেখে দিয়েছিলেন আলমারিতে। বছরে একবার সব শাড়ি রোদে মেলে দেওয়া হতো, তারপর রোদের তাপে উষ্ণ শাড়িগুলোর ভাঁজে ন্যাপথলিন দিয়ে সেগুলো আবার গুছিয়ে রাখা হতো আলমারিতে।

আমার বিয়ের সময় শাড়ি কিনতে নিজেই গিয়েছিলাম মিরপুরের বেনারসি পল্লীতে। সে এক গল্প বটে, আমিন প্রায়ই অনেককে বলে, সে সময় আমিনের হাতে শাড়ি কেনার পর্যাপ্ত টাকা ছিল না। আমার মা সে কথা জানতে পেরে তার নিজস্ব তহবিল থেকে গোপনে কিছু টাকা গুঁজে দিয়েছিলেন আমার হাতে। সেই টাকা নিয়ে আমিন আর আমি প্রথম গেলাম মিরপুর থানায়। না, থানায় তো আর শাড়ি পাওয়া যায় না। থানায় গেলাম কারণ, থানার তরুণ এসআই আরিফ ছিল আমাদের বন্ধু। আরিফ নিজে থেকেই শাড়ি কিনতে গেলে আমাদের সঙ্গী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। যাই হোক, আরিফ তার টহল পুলিশের জিপে আমাদের তুলে নিয়ে ঢুকল বেনারসি পল্লীতে। পুলিশের গাড়ি দেখে বিক্রেতাদের কাছে আমাদের কদর গেল বেড়ে। তারা বেশ ভালো মানের শাড়িগুলো মেলে ধরল আমাদের সামনে। সেগুলো থেকেই একটা লাল-সোনালি কাতান পছন্দ করা হলো বিয়ের শাড়ি হিসেবে। আমি অবশ্য অনেক দিন অন্য মানুষের বিয়েতেও ওই শাড়িটা পরেছি।

তবে এটা ঠিক, আধুনিক বাঙালি নারীর জীবনে শাড়ি আর আগের মতো প্রাত্যহিকতায় নেই বরং এটি আনুষ্ঠানিকতায় রূপান্তরিত হয়েছে। উৎসব অনুষ্ঠানে বাঙালি নারীরা তো শাড়ি পরেই। যেমন পহেলা বৈশাখের লাল সাদা শাড়ি, গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে লাল হলুদ শাড়ি, বিয়ের অনুষ্ঠানে জমকালো কাতান বা বেনারসি, জন্মদিনের অনুষ্ঠান, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, ঈদের দিন বা পূজা পার্বণে শাড়ির চল আছেই।

সেটাই বা মন্দ কি? সময় পাল্টাবে, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের চলতেই হবে। কিন্তু শাড়ির আবেদন এমনই চিরন্তন, যা বাঙালি নারীর কাছে কখনোই ফুরোবে না। আজকাল তো বিদেশিরাও দেখি দিব্যি শাড়ি পরেন। মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাটের শাড়ি পরা ছবি সব খানেই পাওয়া যাবে। প্রবাসী বাংলাদেশিরা শাড়িকে বয়ে নিয়ে গেছেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। বিশেষ করে ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগের প্রধান রোকেয়া হায়দারের নাম বলতেই হয়। বাংলাদেশে যখন এসেছেন তাকে তখন শাড়ি পরাতেই দেখেছি। শুনেছি সুদূর মার্কিন মুল্লুকেও শীত-গ্রীষ্ফ্ম সবসময় তিনি নাকি শাড়ি পরেই চলাফেরা করেন।

পোশাক-আশাকের বিষয়টা আসলে বহুলাংশে আরাম আর অভ্যাসের মামলা। তবে শাড়ি তো শাড়িই। এর মূল্য আর চাহিদা আমাদের কাছে আছেই, থাকবেও। দৈনন্দিনতায় নয়, হয়তো আনুষ্ঠানিকতাতেই আরও বহু যুগ শাড়ির ব্যবহার টিকে থাকবে।

পরবর্তী খবর পড়ুন : শোভমানা

ভারতের শ্বাস রুদ্ধ করে ’টাই’ আফগানদের

ভারতের শ্বাস রুদ্ধ করে ’টাই’ আফগানদের

ভারত 'বধ' করেই ফেলেছিল আফগানিস্তান। কিন্তু ম্যাচটা শেষ পর্যন্ত টাই ...

১৪ দল-বিএনপি মুখোমুখি

১৪ দল-বিএনপি মুখোমুখি

রাজনীতিতে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও কর্মসূচিকে ঘিরে উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে। এবার ...

পল্টন-সোহরাওয়ার্দী কোনোটাই পাচ্ছে না বিএনপি

পল্টন-সোহরাওয়ার্দী কোনোটাই পাচ্ছে না বিএনপি

আগামীকাল বৃহস্পতিবার প্রথমে রাজধানীতে জনসভা করার ঘোষণা দিয়েছিল বিএনপি। ওইদিন ...

শীর্ষ চার রুশ ব্লগার বাংলাদেশে

শীর্ষ চার রুশ ব্লগার বাংলাদেশে

বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনাকে রাশিয়ার জনগণের সামনে তুলে ধরা এবং দ্বিপক্ষীয় ...

ভূমিহীনের জন্য বরাদ্দ জমিতে বড়লোকের পুকুর

ভূমিহীনের জন্য বরাদ্দ জমিতে বড়লোকের পুকুর

মুক্ত জলাশয়ে মাছ ধরে তা বিক্রি করে সংসার চলতো ভূমিহীন ...

জাতীয় ঐক্যকে চাপে রাখবে আ'লীগ ও ১৪ দলীয় জোট

জাতীয় ঐক্যকে চাপে রাখবে আ'লীগ ও ১৪ দলীয় জোট

শুরুতে স্বাগত জানালেও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া গঠন এবং সরকারবিরোধীদের নিয়ে ...

জিততেই হবে আজ

জিততেই হবে আজ

অতীতের ভুল তারা কখনোই স্বীকার করে না। মানতে চায় না ...

প্রশাসনে নির্বাচনী রদবদল

প্রশাসনে নির্বাচনী রদবদল

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রশাসন সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে ...