ক্ষমতা নিয়ে দ্বন্দ্ব-বিবাদ

সমাজ

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

মযহারুল ইসলাম বাবলা

প্রাত্যহিক জীবনে আমরা সবাই নিঃশঙ্ক-নিরাপদে থাকতে চাই। নিজেদের ক্ষতিকারক সন্দেহভাজন শত্রুর বিষয়ে কমবেশি সর্বদা সজাগ-সচেতন থাকি। বাস্তবতা হচ্ছে, কে যে প্রকৃত শত্রু, আর কে মিত্র- সেটা কিন্তু আমাদের অজ্ঞাতেই থেকে যায়। সন্দেহবশত কাউকে কাউকে শত্রু বিবেচনায় সতর্ক থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই শেষ রক্ষা হয় না। শত্রু নির্ধারণে আমরা প্রায়শ ভুল করে থাকি। প্রবচন আছে- 'ঘরের শত্রু বিভীষণ।' প্রবচনটি পৌরাণিকে আর্য রাম-লক্ষ্মণ ও অনার্য রাবণের মধ্যে লঙ্কার যুদ্ধে রাবণের পরাজয়ের মূলে তারই ভ্রাতা বিভীষণের বিশ্বাসঘাতকতাকে কেন্দ্র করে প্রবচনটি ভারতবর্ষব্যাপী প্রচলিত। অর্থাৎ দূরের শত্রু কখনও ক্ষতি করতে পারে না; নিকটস্থ ছদ্মবেশী মিত্রদের সহযোগিতা ব্যতিরেকে।

আমাদের সামাজিক জীবনে এমনকি রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা পর্বের নৃশংস ঘটনার পেছনে ঘরের অর্থাৎ নিকটজনের বিশ্বাসভঙ্গের কারণেই শত্রুপক্ষের বিজয় সম্ভব হয়েছে। আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনেও অনুরূপ ঘটনা প্রায়ই ঘটে। পৈতৃক অর্থ-সম্পদ নিয়ে বিরোধে ভাই-ভাইয়ে, বোন-বোনে কিংবা ভাই-বোনে ওই সম্পত্তির কারণে পরস্পর চরম শত্রু হয়ে ওঠে। পরিণতিতে হানাহানি, বিবাদ-বচসা, মামলা-মোকদ্দমা থেকে আইনি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়া তো সাধারণ ঘটনা। সম্পত্তির জন্য ভাই-বোন হত্যার ঘটনাও যে ঘটে না, তা নয়। পিতা-পুত্র, স্বামী-স্ত্রী, ভাই-ভাই, বোন-ভাইয়ের সম্পর্ক-সম্প্রীতি ভেঙে পড়ে ওই উত্তরাধিকার বিষয়ক অর্থ-সম্পত্তির কারণেই। অর্থাৎ সম্পত্তি ও ক্ষমতার প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সর্বাধিক শত্রুতার ঘটনা ঘটে। এটা পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন, রাজনৈতিক ইতিহাস, সাহিত্যেও আমরা দেখতে পাই।

ভারতবর্ষের সুদীর্ঘ ইতিহাসের সব পর্বেই ক্ষমতা ও সম্পত্তির কারণে ভাই ভাইকে, ভাই বোনকে, পুত্র পিতাকে, পিতা পুত্রকে, জামাতা শ্বশুরকে, সেনাপতি রাজাকে হত্যা করে রাজ্য দখল করেছে- এমন অজস্র দৃষ্টান্ত রয়েছে। ভারতীয় পৌরাণিকেও ক্ষমতার প্রভাব বিস্তারে শত্রু-মিত্রের অসংখ্য যুদ্ধবিগ্রহের কথাও উল্লেখ রয়েছে। বাংলা সাহিত্য, বিশ্বসাহিত্যেও সম্পত্তি, ক্ষমতা, নারীকে নিয়ে দ্বন্দ্ব-বিবাদের প্রচুর শত্রুতার ঘটনা বর্ণিত আছে। সেখানেও শত্রুরা প্রধানত নিকটজনই; দূরের কেউ নয়। ভারতবর্ষ সুদীর্ঘকাল বহিরাগত মুসলিমদের শাসনাধীনে ছিল। মুসলিম শাসকদের আগমন এবং দখল প্রক্রিয়ায় শক্তি প্রয়োগ যেমন ছিল, তেমনি ছিল স্থানীয়দের সহায়তা। স্থানীয় সহায়তা ব্যতিরেকে শুধু শক্তি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি শাসন সম্ভব হতো না। বহিরাগত মুসলিম শাসকরা ভারতবর্ষে স্থায়ী হয়েছিল। তারা সম্পদ পাচার না করে লুণ্ঠিত বা অর্জিত অর্থ-সম্পদ এ দেশেই বিনিয়োগ করেছে। নানা উপায়ে ব্যয় করেছে। তারা বহিরাগত ছিল বটে; তবে ভারতবর্ষকেই নিজ দেশ বিবেচনায় স্থায়ী নাগরিকরূপে চিরকাল ভারতবর্ষেই অতিবাহিত করে গেছে। তাই তাদেরকে বহিরাগত বলা অনুচিত হবে। এসব শাসকের ক্ষেত্রেও ক্ষমতা নিয়ে পিতা-পুত্র, ভাই-ভাই, ভাই-বোন, জামাই-শ্বশুর পরস্পর চরম শত্রু হয়ে একে অপরকে বন্দি, হত্যার অগণিত ঘটনা ঘটেছে। নিকটজনের পরস্পর শত্রুতে পরিণত হওয়ার মূলেই রয়েছে সম্পত্তি ও ক্ষমতা। ব্যক্তিগত মালিকানা ও ক্ষমতার কারণেই মানুষ পরস্পর শত্রুতে পরিণত হয়ে ওঠে। এটাই চিরন্তন বাস্তবতা।

ব্রিটিশরা বাণিজ্যের অজুহাতে ভারতবর্ষে এলেও এ দেশের সম্পদে আকৃষ্ট হয়ে তারা দেশ দখলের মতলব এঁটেছিল। বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজন্যদের প্রত্যক্ষ বিশ্বাসভঙ্গের সুযোগে শঠতার যুদ্ধে রাজ্য দখল করে নেয়। এর পর গোটা ভারতবর্ষ ব্রিটিশদের অধীন হয়। যুদ্ধবিগ্রহের পাশাপাশি স্থানীয়দের অর্থবিত্ত, সুযোগের নানা প্রলোভনে দেশমাতৃকার বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতায় প্ররোচিত করার ফলে সারা ভারতবর্ষ বহিরাগত ছদ্মবেশী বণিক ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনাধীন হয়। তথাকথিত বহিরাগত মুসলিম শাসক এবং বহিরাগত ব্রিটিশ শাসকদের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্যটি হচ্ছে, মুসলিম শাসকরা সুদীর্ঘকাল স্থায়ীভাবে বসবাসে ভারতবর্ষীয় নাগরিক হয়ে গিয়েছিল। তাদের অর্থ-সম্পদ এ দেশেই থেকে গিয়েছিল। ব্রিটিশরা কিন্তু তা করেনি। তারা এ দেশ থেকে অর্থ-সম্পদ একচেটিয়া লুণ্ঠন করে নিজ দেশে পাচার করেছিল তাদের পুরো শাসনামলে। আমাদের দেশীয় উৎপাদিত কাঁচা পণ্য নিজেদের দেশে পাঠিয়ে পাকা পণ্যে রূপান্তর করে আমাদের দেশেই সেই পণ্যের একচেটিয়া বাজার গড়ে তুলেছিল। দুই শাসকদের মধ্যকার অর্থ-সম্পদ বিষয়ে মৌলিক পার্থক্য থাকলেও তারা শাসক হিসেবে ভারতবর্ষীয় জনগণের স্বার্থ, আশা-আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে নিজেদের সাম্রাজ্যবাদী শাসন-শোষণ ও লুণ্ঠন অব্যাহত রেখেছিল। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, মিয়ানমার ব্রিটিশ ইন্ডিয়া ঔপনিবেশিক শাসন থেকে একে একে মুক্তিলাভ করলেও জনগণের ভাগ্য অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে। কোনো রাষ্ট্রেই জনগণের শাসন কায়েম হতে পারেনি। শুধু ক্ষমতার হাতবদল ঘটেছে। অথচ ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তির লড়াইয়ে অগণিত মানুষের ত্যাগ-আত্মত্যাগেও জনগণের রাষ্ট্ররূপে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি খণ্ডিত ভারত-পাকিস্তান। কেননা, জনগণের লড়াই-সংগ্রামে ব্রিটিশদের পরাস্ত ও বিতাড়ন করা সম্ভব হয়নি। বেগতিক অবস্থা বুঝতে পেরেই ব্রিটিশরা দেশীয় শাসকশ্রেণির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দ্রুত কেটে পড়েছিল। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র ভেঙে স্বাধীন বাংলাদেশও জনগণের কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র হতে পারেনি জাতীয়তাবাদী শাসকশ্রেণির ক্ষমতা কুক্ষিগত করার কারণে। তাই অনায়াসে বলা যায়, সর্বত্রই ঘটেছে শুধু ক্ষমতার হস্তান্তর। অর্থাৎ সুলতানি আমল, মোগল আমল, ঔপনিবেশিক শাসন অবসানেও তিন খণ্ডে বিভক্ত তিন স্বাধীন রাষ্ট্র সমষ্টিগত জনগণের মিত্র না হয়ে বিপরীত অবস্থান নেয়।

আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য পাঁচ বছর মেয়াদের রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্বে সরকার গঠিত হওয়ার সাংবিধানিক বিধিবিধান রয়েছে। জনগণের সমর্থনের ভিত্তিতেই দলীয় রাজনৈতিক সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেয়ে থাকে। আমরা পাঁচ বছর অন্তর রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সরকার নির্বাচিত করে থাকি। কিন্তু আমাদের এযাবৎকালের অভিজ্ঞতাটি হচ্ছে, জনগণ দ্বারা নির্বাচিত একটি সরকারও জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে সক্ষম হয়নি। তার পরও জনগণ প্রতিটি নির্বাচনে ভোট প্রদান করে শাসক নির্বাচনে। জনপ্রতিনিধিত্বকারী সরকারমাত্রই জনগণের মিত্র নয়; ক্ষমতায় বসেই বিপরীত অবস্থান নিতে বিলম্ব করে না। আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থায় প্রতিটি নির্বাচনে প্রার্থীরা মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট প্রার্থনা করে। তাদের অতিশয় বিনয়ে মানুষ নিকটজন ভেবে ভোট প্রদান করে। ভোটে জেতার পর ওই বিজয়ী জনপ্রতিনিধিদের অনেকেই নিকটজন তো নয়ই, বরং জনগণের শত্রুতে পরিণত হতে সময় নেয় না। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এটাই বাস্তবিক ধারাবাহিকতা।

বাইরের শত্রু শুধু ইন্ধন জোগাতে পারে। মূল শত্রুতার ভূমিকা পালন করে নিকটজনই। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালের মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে বাইরের ইন্ধন থাকলেও ঘটনাটি ঘটিয়েছে এ দেশেরই কতিপয় বিপথগামী। আমাদের পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রব্যবস্থাজুড়ে এই যে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও একক নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিয়ে পরস্পরের দ্বন্দ্ব-বিবাদ, হিংসা-হানাহানি, খুন ইত্যাকার ঘটনা ঘটে; তার অবসানের একমাত্র উপায় হচ্ছে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা; পাশাপাশি জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রবর্তন; যা বিদ্যমান ব্যবস্থাকে অক্ষুণ্ণ রেখে সম্ভব হবে না। তাই সর্বাগ্রে প্রয়োজন ব্যবস্থাটির আমূল পরিবর্তন এবং ধর্মনিরপেক্ষ-জনগণতান্ত্রিক সমতার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। বিদ্যমান অমানবিকতা থেকে পরিত্রাণের বিকল্প পথ কিন্তু আর নেই। এই বাস্তবিক সত্যটি উপলব্ধি ও পরিত্রাণের উপায়টি যথাযথ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই পরিসমাপ্তি ঘটবে ব্যক্তিগত মালিকানার অর্থ-সম্পদ এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব-বিবাদ, হিংসা-হানাহানি ও হত্যা-খুন।

সাংবাদিক
সর্বোচ্চ ৬৫ আসনে ছাড় দেবে বিএনপি

সর্বোচ্চ ৬৫ আসনে ছাড় দেবে বিএনপি

একাদশ সংসদ নির্বাচনে জোট শরিকদের মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে মহাসংকটে ...

গ্রামাঞ্চল পাবে শহরের সুবিধা

গ্রামাঞ্চল পাবে শহরের সুবিধা

গ্রামাঞ্চলকে শহরের সুবিধায় আনতে ব্যাপক পরিকল্পনা রয়েছে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ...

প্রত্যাবাসন আজ শুরু হচ্ছে না

প্রত্যাবাসন আজ শুরু হচ্ছে না

বহুল প্রতীক্ষিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আজ বৃহস্পতিবার শুরু হচ্ছে না। ...

ডায়াবেটিস থেকে শিশুদের রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে

ডায়াবেটিস থেকে শিশুদের রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে

ঘাতক ব্যাধি ডায়াবেটিস থেকে শিশুদের রক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ...

লোকজ সুরে খুঁজে পাই প্রাণের স্পন্দন

লোকজ সুরে খুঁজে পাই প্রাণের স্পন্দন

'লোকগানের কথায় রয়েছে জীবনের দিকনির্দেশনা। এর ঐন্দ্রজালিক সুর অদ্ভুত এক ...

দুর্ধর্ষ এক ভাড়াটে খুনির থানায় যাতায়াত!

দুর্ধর্ষ এক ভাড়াটে খুনির থানায় যাতায়াত!

দক্ষ রাজমিস্ত্রি হিসেবেই মিরপুর, ভাসানটেক ও কাফরুল এলাকার মানুষজন চিনতেন ...

নির্বাচন পেছানোর দাবি নিয়ে বসবে নির্বাচন কমিশন: সচিব

নির্বাচন পেছানোর দাবি নিয়ে বসবে নির্বাচন কমিশন: সচিব

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পেছাতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দাবি নিয়ে নির্বাচন ...

ইসির সঙ্গে বৈঠকে নির্বাচন পেছানোর বিরোধিতা আ. লীগের

ইসির সঙ্গে বৈঠকে নির্বাচন পেছানোর বিরোধিতা আ. লীগের

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আবারও পেছানোর বিরোধিতা করেছে আওয়ামী ...